বাংলাদেশ ব্যাংক প্রকাশিত সাম্প্রতিক মুদ্রাস্ফীতি বিশ্লেষণ অনুযায়ী, অর্থবছর ২০২৫-২৬ (FY26) এর শেষ ত্রৈমাসিকে (অক্টোবর‑ডিসেম্বর) আমদানি পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি সামগ্রিক মুদ্রাস্ফীতিতে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখে। একই সময়ে দেশীয় উৎপাদিত খাদ্য ও অখাদ্য পণ্যের অবদান হ্রাস পায়। এই পরিবর্তনগুলো দেশের মূল্য স্থিতিশীলতার ওপর নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।
সামগ্রিক ভোক্তা মূল্যসূচক (CPI) অনুযায়ী, অক্টোবর‑ডিসেম্বর ত্রৈমাসিকে মুদ্রাস্ফীতি গড়ে ৮.৩ শতাংশে নেমে আসে, যা পূর্ব ত্রৈমাসিক (জুলাই‑সেপ্টেম্বর) এর ৮.৪ শতাংশের তুলনায় সামান্য কম। যদিও হ্রাস সূক্ষ্ম, তবে মুদ্রাস্ফীতির গতি ধীর হওয়ার ইঙ্গিত দেয়।
বিশ্লেষণে দেখা যায়, আমদানি নির্ভর পণ্যের মুদ্রাস্ফীতি অবদান ২৪ শতাংশ থেকে বাড়ে ৩০ শতাংশে, যেখানে দেশীয় পণ্যের অংশ ৭৬ শতাংশ থেকে কমে ৭০ শতাংশে নেমে আসে। অর্থাৎ, মূল্যচাপের মূল চালিকাশক্তি এখন বেশি করে বিদেশি পণ্যের দিক থেকে আসছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক উল্লেখ করেছে যে, অর্থবছর ২০২৪-২৫ (FY25) এর প্রথম দুই ত্রৈমাসিকে ঐতিহাসিক উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি দেখা গিয়েছিল, যা তৃতীয় ত্রৈমাসিকে ধীরে ধীরে কমে এবং বর্তমান অর্থবছরের দ্বিতীয় ত্রৈমাসিক পর্যন্ত হ্রাসের প্রবণতা বজায় রেখেছে। এই ধারাবাহিক হ্রাস দেশের অর্থনৈতিক নীতি প্রয়োগের ফলাফল হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
খাদ্য মুদ্রাস্ফীতি প্রথমার্ধে দ্বি‑অঙ্কে থাকলেও, দ্বিতীয়ার্ধে এক অঙ্কে নেমে আসে এবং অক্টোবর‑ডিসেম্বর ত্রৈমাসিকে গড়ে ৭.৪ শতাংশে স্থিত হয়। এই পতন মূলত কিছু মৌলিক খাদ্যদ্রব্যের দাম কমে যাওয়ার ফলে ঘটেছে।
বাজার পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, অধিকাংশ নির্বাচিত পণ্যের খুচরা ও পাইকারি মূল্য হ্রাস পেয়েছে, তবে সয়াবিন ও পেঁয়াজের দাম ব্যতিক্রম রয়ে গেছে। বিশেষ করে পেঁয়াজের দাম সাম্প্রতিক সপ্তাহে স্থিতিশীলতা বজায় রাখেনি।
রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে যে, মুরগি ও পেঁয়াজের দাম খুচরা ও পাইকারি উভয় বাজারে পূর্ব ত্রৈমাসিকের তুলনায় স্পষ্টভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। এই দুই পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি ভোক্তাদের দৈনন্দিন ব্যয়ের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলছে।
অখাদ্য পণ্যের মুদ্রাস্ফীতি FY25 তে গড়ে প্রায় ৯.৫ শতাংশে স্থিত ছিল, যা FY26 এর দ্বিতীয় ত্রৈমাসিকে হালকা হ্রাস পেয়ে ৯.১ শতাংশে নেমে আসে। যদিও হ্রাস সূক্ষ্ম, তবু অখাদ্য পণ্যের দাম এখনও তুলনামূলকভাবে উচ্চ স্তরে রয়েছে।
খাদ্য মুদ্রাস্ফীতির প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে প্রোটিন ভিত্তিক খাবার, শস্য এবং মসলা চিহ্নিত করা হয়েছে। এই তিনটি গোষ্ঠীর দাম বৃদ্ধি সামগ্রিক খাদ্যমূল্যবৃদ্ধির মূল কারণ হিসেবে কাজ করেছে।
বিশেষ করে প্রোটিন ভিত্তিক পণ্যগুলো অক্টোবর‑ডিসেম্বর ত্রৈমাসিকে মোট খাদ্য মুদ্রাস্ফীতির ৬২.৮ শতাংশের বেশি অবদান রাখে। মাংস, ডিম ও দুগ্ধজাত পণ্যের দাম বৃদ্ধিই এই উচ্চ অনুপাতের প্রধান কারণ।
শস্যের অবদান তুলনামূলকভাবে কম, প্রায় ১.৪ শতাংশ, তবে মসলা ও অন্যান্য মৌলিক পণ্যের দামও সামান্য বাড়ার প্রবণতা দেখায়। এই সূক্ষ্ম পরিবর্তনগুলো সামগ্রিক মূল্যস্তরে প্রভাব ফেলতে পারে।
বিশ্লেষকরা ইঙ্গিত করছেন, আমদানি পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি যদি ধারাবাহিক থাকে, তবে মুদ্রাস্ফীতি পুনরায় তীব্র হতে পারে এবং নীতি নির্ধারকদের জন্য অতিরিক্ত সমন্বয় প্রয়োজন হবে। একই সঙ্গে, প্রোটিন ভিত্তিক পণ্যের দাম স্থিতিশীল না হলে ভোক্তাদের ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস পেতে পারে। তাই, ভবিষ্যতে মুদ্রা হার, বৈশ্বিক পণ্যের সরবরাহ শৃঙ্খল এবং দেশীয় উৎপাদন ক্ষমতা পর্যবেক্ষণ করা জরুরি।



