অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ পর্যায়ে আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল রোববার রাতে ফেসবুকে দীর্ঘ পোস্ট প্রকাশ করে সমালোচকদের উত্তর দেন। পোস্টে তিনি বলেন, তিনি কোনো একক পদক্ষেপের দায়ী নন; সব কাজের পেছনে আইন মন্ত্রণালয়ের সমন্বয় রয়েছে। তবে তিনি স্বীকার করেন, প্রতিটি পদক্ষেপে নিজে অংশগ্রহণ করেছেন।
আসিফ নজরুল পোস্টে জোর দিয়ে বলেন, সমালোচনা করা স্বাভাবিক, তবে তার আগে কাজের প্রকৃত বিষয়গুলো জানলে ভাল হয়। তিনি পাঠকদের অনুরোধ করেন, তার কাজের তালিকা না জেনে তীব্র মন্তব্য না করতে। এই আহ্বানটি তার নিজস্ব কর্মসূচি প্রকাশের সঙ্গে যুক্ত, যেখানে তিনি নিজের দৈনন্দিন সময়সূচি তুলে ধরেছেন।
তিনি উল্লেখ করেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় তিনি একসাথে তিনটি মন্ত্রনালয়ের দায়িত্ব পালন করেছেন। কাজের চাপের কথা বলার সময় তিনি বলেন, প্রায় শুরুর সময় অফিসে পৌঁছে রাত আট থেকে নয়টা পর্যন্ত কাজ চালিয়ে গেছেন, তারপর সামান্য বিশ্রাম নিয়ে গভীর রাতে বাড়িতে আবার কাজ চালিয়ে গেছেন। বহু শুক্রবার ও শনিবার তিনি সচিবালয়ের অফিসে উপস্থিত ছিলেন।
আইন উপদেষ্টার পাশাপাশি তিনি প্রবাসী কল্যাণ বিষয়েও দায়িত্ব পালন করেছেন। ছাত্র উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার পদত্যাগের পর তিনি ক্রীড়া উপদেষ্টার দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এই পরিবর্তনটি তফসিল ঘোষণার আগে ঘটেছিল এবং তার কাজের পরিধি আরও বিস্তৃত করে।
ক্রীড়া উপদেষ্টা হিসেবে তিনি আইপিএল থেকে মুস্তাফিজকে বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত এবং বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে ভারত না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাপক সমালোচনার মুখোমুখি হন। উভয় বিষয়ই দেশের ক্রীড়া নীতি ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের সংবেদনশীলতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিল।
সমালোচনার পরিসর কেবল ক্রীড়া ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ না থেকে, ২৪শে আন্দোলনের পর আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারের সময়েও তিনি বিভিন্ন নীতি ও সংস্কার নিয়ে সমালোচনার শিকার হন। বিশেষ করে আইন মন্ত্রণালয়ের সংস্কারমূলক পদক্ষেপগুলোকে কিছু লোক ব্যক্তিগত স্বার্থের দিক হিসেবে দেখেছেন।
আসিফ নজরুলের ফেসবুক পোস্টটি বিএনপি সরকার গঠনের দুদিন আগে প্রকাশিত হয়, যেখানে তিনি তার সমালোচকদের উদ্দেশ্যে স্পষ্ট বার্তা দেন। পোস্টের সময়সূচি অনুযায়ী, তিনি তরিক রহমানের নেতৃত্বে গঠিত নতুন সরকারের আগমনের পূর্বে নিজের অবস্থান স্পষ্ট করতে চেয়েছেন।
পোস্টে তিনি জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর আইন মন্ত্রণালয়ের অর্জনগুলোও উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, আইন মন্ত্রণালয় ২২টি আইনি সংস্কার, ১৫টি প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার এবং ডিজিটালাইজেশন প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে। এছাড়া ২৪,২৭৬টি হয়রানিমূলক মামলা প্রত্যাহার করা হয়েছে এবং গণহত্যা মামলায় বিচার ব্যবস্থা সমর্থন করা হয়েছে।
আইনি সংস্কারগুলোর মধ্যে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) অধ্যাদেশের সংশোধন, সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ অধ্যাদেশ, সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ, বাণিজ্যিক আদালত অধ্যাদেশ, গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশ অন্তর্ভুক্ত। এছাড়া দেওয়ানি ও ফৌজদারি আইনের সংশোধন, নারী ও শিশুর নির্যাতন দমন সংক্রান্ত আইন পরিবর্তন এবং গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশে সংস্কারও করা হয়েছে।
প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারগুলোতে মন্ত্রণালয়ের কাঠামো পুনর্গঠন, ডিজিটাল সেবা চালু করা এবং তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবস্থার আধুনিকায়ন অন্তর্ভুক্ত। এই উদ্যোগগুলোকে তিনি আইন মন্ত্রণালয়ের টিমওয়ার্কের ফলাফল হিসেবে উল্লেখ করেন, ব্যক্তিগত কৃতিত্বের নয়।
আসিফ নজরুলের এই পোস্টের মাধ্যমে তিনি নিজের ভূমিকা পরিষ্কার করতে চেয়েছেন এবং সমালোচকদের কাছে কাজের প্রকৃত পরিধি জানার আহ্বান জানিয়েছেন। ভবিষ্যতে বাংলাদেশ সরকার যদি এই সংস্কারগুলোকে চালিয়ে যায়, তবে আইন মন্ত্রণালয়ের নীতি ও কাঠামোতে আরও স্থায়ী পরিবর্তন প্রত্যাশা করা যায়। তবে সমালোচকরা এখনও দাবি করছেন, এই সংস্কারগুলো বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা দরকার।



