মিউনিখ সিকিউরিটি কনফারেন্সে ইউরোপীয় শীর্ষ নেতারা মার্কিন সরকারের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নিজের প্রতিরক্ষা শক্তি বাড়ানোর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। এই পদক্ষেপের পেছনে ডোনাল্ড ট্রাম্পের গ্রিনল্যান্ড অধিগ্রহণের প্রচেষ্টা এবং ইউক্রেনের যুদ্ধের দীর্ঘায়িত প্রভাব রয়েছে।
ইউরোপীয় কমিশনের সভাপতি উর্সুলা ভন ডার লেয়েন উদ্বোধনী সেশনে উল্লেখ করেন, “Some lines have been crossed that cannot be uncrossed anymore,” এবং ইউরোপের নিরাপত্তা নীতিতে মৌলিক পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেন। তার বক্তব্যের সঙ্গে সঙ্গে অংশগ্রহণকারীরা যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক নীতি পরিবর্তনকে নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
ডোনাল্ড ট্রাম্পের হোয়াইট হাউসে পুনরায় শাসনকালে ট্রান্সঅ্যাটলান্টিক সম্পর্ক ইতিমধ্যে টানাপোড়েনের মুখে ছিল। গ্রিনল্যান্ডকে যুক্তরাষ্ট্রের অংশ করতে চাওয়া তার উদ্যোগ ইউরোপীয় দেশগুলোর মার্কিন প্রতিশ্রুতির ওপর সন্দেহ বাড়িয়ে দেয়। এই দাবি ইউরোপীয় নেতাদের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদী নিরাপত্তা গ্যারান্টি নিয়ে প্রশ্ন তুলতে সহায়তা করে।
মার্কো রুবিও, মার্কিন সরকারের পররাষ্ট্র মন্ত্রী, মিউনিখে তার ভাষণে ইউরোপের সঙ্গে সহযোগিতা প্রকাশ করেন এবং গত বছর ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের তুলনায় নরম স্বর ব্যবহার করেন। তবে তিনি ইউরোপের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক দিকনির্দেশনা সমালোচনা করেন এবং ন্যাটো, রাশিয়া বা ইউক্রেনের যুদ্ধের কোনো উল্লেখ করেননি। রুবিওর এই সীমিত আশ্বাস ইউরোপীয় শাসকগণকে আরও স্বতন্ত্র নিরাপত্তা নীতি অনুসন্ধানে উদ্বুদ্ধ করেছে।
গত বছর জেডি ভ্যান্সের বক্তৃতা তুলনায় রুবিওর সুর বেশি উষ্ণ হলেও, উভয়ই যুক্তরাষ্ট্রের ইউরোপীয় নিরাপত্তা গ্যারান্টি সম্পর্কে স্পষ্ট প্রতিশ্রুতি দেয়নি। রুবিও উল্লেখ করেন যে যুক্তরাষ্ট্র ইউরোপের সঙ্গে কাজ করতে ইচ্ছুক, তবে ইউরোপের নিজস্ব কৌশলগত দিকনির্দেশনা পুনর্বিবেচনা করা প্রয়োজন। এই অবস্থান ইউরোপীয় দেশগুলোর মধ্যে স্বনির্ভরতা বাড়ানোর তাগিদকে তীব্র করে।
ইউক্রেনের যুদ্ধ এখন পঞ্চম বর্ষে প্রবেশ করতে চলেছে, আর মস্কোকে ইউরোপের প্রতিবেশী দেশগুলো ক্রমবর্ধমান হুমকি হিসেবে দেখছে। এই পরিস্থিতিতে ইউরোপীয় শীর্ষ নেতারা নিজেদের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা ত্বরান্বিত করার এবং মার্কিন সরকারের ওপর নির্ভরতা কমানোর পরিকল্পনা ঘোষণা করেছেন। তারা যৌথ প্রশিক্ষণ, সরঞ্জাম ক্রয় এবং গবেষণা-উন্নয়ন প্রকল্পে বিনিয়োগ বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
মার্কিন সরকার আশা করে যে ইউরোপ ভবিষ্যতে কনভেনশনাল প্রতিরক্ষার প্রধান দায়িত্ব নেবে, আর তার পরিবর্তে যুক্তরাষ্ট্র ইউরোপের ওপর পারমাণবিক ছাতা বজায় রাখবে এবং ন্যাটোর পারস্পরিক রক্ষা চুক্তি মেনে চলবে। এই নীতি অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্র ইউরোপের পারমাণবিক সুরক্ষা নিশ্চিত করবে, তবে প্রচলিত সেনাবাহিনীর দায়িত্ব ইউরোপীয় দেশগুলোকে অর্পণ করা হবে।
জার্মানির চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্জ, ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাক্রন এবং যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কেয়ার স্টারমার মিউনিখে ন্যাটোর মধ্যে একটি শক্তিশালী “European pillar” গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেন। তারা ইউরোপীয় ইউনিয়নের যৌথ প্রতিরক্ষা উদ্যোগ, যেমন PESCO এবং ইউরোপীয় প্রতিরক্ষা তহবিল,কে শক্তিশালী করার কথা উল্লেখ করেন। এই উদ্যোগগুলো ইউরোপকে স্বতন্ত্রভাবে বড় আকারের সামরিক প্রকল্প পরিচালনা করতে সক্ষম করবে।
ফ্রিডরিখ মের্জ সম্মেলনে বলেন, “This new beginning is right under all circumstances. It is right if the United States continues to distance itself. It is right as long as we cannot guarantee our own security on our own,” এবং ইউরোপীয় নিরাপত্তা কাঠামোর পুনর্গঠনের প্রয়োজনীয়তা জোর দিয়ে বলেন। তার এই মন্তব্য ইউরোপের স্বনির্ভরতা ও নিরাপত্তা কৌশলকে পুনর্নির্ধারণের সংকেত দেয়।
বিশ্লেষকরা অনুমান করছেন যে ইউরোপীয় দেশগুলো রক্ষা ব্যবস্থা শক্তিশালী করতে সামরিক ব্যয় বাড়াবে, যৌথ প্রশিক্ষণ ও সরঞ্জাম ক্রয় বাড়াবে এবং ন্যাটোর মধ্যে ইউরোপীয় নেতৃত্বের ভূমিকা বাড়াবে। একই সঙ্গে ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের নীতি পরিবর্তন হলে ইউরোপের কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
ভবিষ্যতে ইউরোপীয় ইউনিয়ন সম্ভবত ন্যাটোর মধ্যে “ইউরোপীয় স্তম্ভ”কে আরও স্বতন্ত্র কাঠামোতে রূপান্তরিত করবে, যাতে যুক্তরাষ্ট্রের নীতি পরিবর্তনের ঝুঁকি কমে। এছাড়া, ইউরোপীয় দেশগুলো পারমাণবিক সুরক্ষা ছাড়াও সাইবার নিরাপত্তা, মহাকাশ ও ড্রোন প্রযুক্তিতে সহযোগিতা বাড়াতে পারে। এই সব পদক্ষেপ ইউরোপকে দীর্ঘমেয়াদে নিরাপত্তা ক্ষেত্রে স্বনির্ভর করে তুলবে।
সারসংক্ষেপে, মিউনিখে গৃহীত সিদ্ধান্তগুলো ইউরোপকে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নিজের প্রতিরক্ষা ক্ষমতা বাড়ানোর দিকে ধাবিত করে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের গ্রিনল্যান্ড দাবি এবং ইউক্রেনের যুদ্ধের প্রভাব এই পরিবর্তনের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করেছে, এবং ন্যাটোর মধ্যে ইউরোপীয় স্তম্ভের শক্তিশালীকরণ ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা নীতির কেন্দ্রীয় উপাদান হবে।



