৯ ফেব্রুয়ারি ওয়াশিংটনে বাংলাদেশ সরকার ও মার্কিন সরকার একত্রে এগ্রিমেন্ট অন রিসিপ্রোকাল ট্রেড (এআরটি) স্বাক্ষর করেছে। এই চুক্তি বাণিজ্য ও বিনিয়োগের পরিসর বাড়াতে লক্ষ্যবদ্ধ। সরকার এটিকে দেশের রপ্তানি সক্ষমতা শক্তিশালী করার একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হিসেবে উপস্থাপন করেছে।
প্রায় নয় মাসের ধারাবাহিক আলোচনার পর উভয় পক্ষ শুল্ক কাঠামো ও বাজার প্রবেশের শর্তে একমত হয়। বাংলাদেশ সরকার দাবি করে যে, এআরটি অনুসারে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশি পণ্যের সর্বোচ্চ শুল্ক হার ২০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৯ শতাংশ করা হয়েছে। এই হ্রাস রপ্তানি খরচ কমিয়ে প্রতিযোগিতা বাড়াবে বলে আশা করা হচ্ছে।
চুক্তিতে টেক্সটাইল ও তৈরি পোশাক শিল্পের জন্য বিশেষ সুবিধা অন্তর্ভুক্ত। যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি করা তুলা ও কৃত্রিম তন্তু ব্যবহার করে তৈরি করা পোশাকের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানির সময় শূন্য শুল্ক প্রযোজ্য হবে। ফলে উৎপাদন খরচ হ্রাস পেয়ে রপ্তানি মূল্য আন্তর্জাতিক বাজারে আরও আকর্ষণীয় হবে।
বাংলাদেশ সরকার জানিয়েছে, এ আরটিতে মোট প্রায় দুই হাজার পাঁচশো পণ্যের জন্য শূন্য শুল্ক সুবিধা নিশ্চিত করা হয়েছে। এতে বিভিন্ন ধরণের ওষুধ, কৃষি পণ্য, প্লাস্টিক ও কাঠজাত পণ্য অন্তর্ভুক্ত। এই পণ্যগুলো যুক্তরাষ্ট্রের ভোক্তা বাজারে সরাসরি প্রবেশের পথে শুল্কের বোঝা কমে যাবে।
অন্যদিকে, মার্কিন সরকার বাংলাদেশের বাজারে প্রায় সাত হাজার একশত্রিশ পণ্যের জন্য শুল্ক হ্রাসের প্রস্তাব দিয়েছে। এর মধ্যে চার হাজার নয়শো বিশটি পণ্যের ক্ষেত্রে চুক্তি কার্যকর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে শুল্কমুক্ত সুবিধা প্রদান করা হবে। বাকি পণ্যগুলোর শুল্ক ধাপে ধাপে কমবে; এক হাজার পাঁচশো আটত্রিশটি পণ্যের শুল্ক পাঁচ বছরের মধ্যে শূন্যে নামবে, আর ছয়শো বাহাতিরটি পণ্যের শুল্ক দশ বছরের মধ্যে শূন্যে পৌঁছাবে।
শুল্কমুক্ত না হওয়া মাত্র তিনশো ছাব্বিশটি পণ্যের জন্য চুক্তিতে কোনো হ্রাসের ব্যবস্থা নেই। সরকার উল্লেখ করেছে, অন্যান্য দেশের সঙ্গে করা অনুরূপ চুক্তিতে এই ধরনের ধাপে ধাপে শুল্ক হ্রাসের ধারা সাধারণত দেখা যায় না; বাংলাদেশকে এই সুবিধা বিশেষভাবে প্রদান করা হয়েছে।
এছাড়া, চুক্তিতে কাগজবিহীন বাণিজ্য, বৌদ্ধিক সম্পত্তি অধিকার (আইপিআর) প্রয়োগ, ই-কমার্সে স্থায়ী মোরাটোরিয়াম, নন-ট্যারিফ বাধা হ্রাস, কাস্টমস প্রক্রিয়ার সরলীকরণ ইত্যাদি বিষয়ও অন্তর্ভুক্ত। রুলস অব অরিজিন, স্বাস্থ্য ও উদ্ভিদ সুরক্ষা ব্যবস্থা, কারিগরি বাধা, সরকারি ক্রয়, শ্রম, পরিবেশ, প্রতিযোগিতা, স্বচ্ছতা ও পারস্পরিক সহযোগিতা ইত্যাদি ক্ষেত্রেও সমন্বয় সাধনের পরিকল্পনা রয়েছে।
এই বিস্তৃত ধারা অনুযায়ী, উভয় দেশ বাণিজ্যিক লেনদেনের সময় কাগজপত্রের ব্যবহার কমিয়ে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে স্থানান্তর করতে পারবে। আইপিআর সুরক্ষা শক্তিশালী করা এবং নন-ট্যারিফ বাধা হ্রাসের মাধ্যমে বাজারে প্রবেশের বাধা কমবে বলে আশা করা হচ্ছে। ই-কমার্সে স্থায়ী মোরাটোরিয়াম নতুন স্টার্টআপ ও ডিজিটাল সেবা প্রদানকারীদের জন্য নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করবে।
বিশেষজ্ঞরা উল্লেখ করেন, শুল্ক হ্রাসের পাশাপাশি এই নীতি-নির্দেশক ব্যবস্থা রপ্তানি কাঠামোকে বৈচিত্র্যময় করবে এবং উচ্চ মানের পণ্যের উৎপাদনে উৎসাহ দেবে। টেক্সটাইল ও পোশাক শিল্পের পাশাপাশি ফার্মাসিউটিক্যাল, কৃষি ও কাঠ শিল্পে নতুন বাজারের দরজা খুলে যাবে।
বাজার বিশ্লেষকরা পূর্বাভাস দিচ্ছেন, শূন্য শুল্ক সুবিধা পাওয়া পণ্যের রপ্তানি পরিমাণে প্রথম বছরের মধ্যে ১০-১৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেতে পারে। একই সঙ্গে, যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে প্রবেশের জন্য প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানগুলো অতিরিক্ত বিনিয়োগের সম্ভাবনা বাড়াবে।
তবে, ধাপে ধাপে শুল্ক হ্রাসের সময়সূচি মেনে চলা এবং মানসম্পন্ন পণ্য সরবরাহ নিশ্চিত করা চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে যাবে। সরকারকে উৎপাদন মান উন্নয়ন, লজিস্টিক্স অবকাঠামো শক্তিশালীকরণ এবং কাস্টমস প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা বাড়াতে হবে।
সারসংক্ষেপে, ঢাকা-ওয়াশিংটন চুক্তি বাণিজ্যিক শুল্কে হ্রাস, বিশেষ শিল্পে সুবিধা এবং ডিজিটাল বাণিজ্যের উন্নয়নকে একত্রে সমন্বিত করেছে। বাংলাদেশ সরকার এই চুক্তিকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করার একটি কৌশলগত সুযোগ হিসেবে দেখছে এবং ভবিষ্যতে আরও বিনিয়োগ আকর্ষণ করার লক্ষ্য রাখছে।



