বাহারুল আলম, যিনি ২০ নভেম্বর ২০২৪ তারিখে অবসরে যাওয়ার পর দুই বছরের চুক্তিতে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় বাংলাদেশ পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) নিযুক্ত হন, তার পদত্যাগের গুঞ্জন সরকার ও নিরাপত্তা সংস্থার মধ্যে তীব্র আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। গুঞ্জনটি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দুদিন পর, বিএনপি নেতৃত্বাধীন নতুন সরকারের গঠন প্রত্যাশার মুহূর্তে ছড়িয়ে পড়ে এবং পুলিশ সদর দপ্তর ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে বিষয়টি নিয়ে অভ্যন্তরীণ বৈঠক হয়।
রবিবার রাতে একটি অনলাইন সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলার সময় আইজিপি স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, “এমন কোনো পদত্যাগের ঘটনা ঘটেনি, তথ্যটি সঠিক নয়।” তিনি এই মন্তব্যের মাধ্যমে গুজবকে খণ্ডন করেন এবং তার পদে অবিচল থাকার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। তবে একই দিনে পুলিশ সদর দপ্তরে অনুষ্ঠিত অভ্যন্তরীণ বৈঠকে এক কর্মকর্তা দাবি করেন যে, আইজিপি মিটিংয়ের সময় তার পদত্যাগের ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন। ওই কর্মকর্তা বলেন, “মিটিংয়ে স্যার বলেছিলেন, আমি আর থাকতে চাই না, চলে যাব।”
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আরেকজন কর্মকর্তা একই সংবাদমাধ্যমে জানিয়েছেন যে, আইজিপি পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছেন, তবে মন্ত্রণালয়ের কোনো উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা এই বিষয়টি নিশ্চিত করেননি। এই পারস্পরিক বিরোধী বিবরণগুলো গুজবকে আরও জটিল করে তুলেছে।
বাহারুল আলমের পদত্যাগের গুঞ্জনের পটভূমি ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের সময়ের সঙ্গে যুক্ত। সেই দিন, তখনকার আইজিপি চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মামুন আত্মগোপনে চলে যান এবং মধ্যরাতে মো. ময়নুল ইসলাম নতুন পুলিশ প্রধানের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তিন মাসের মধ্যে সরকার ময়নুল ইসলামকে সরিয়ে দিয়ে অবসরে যাওয়া বাহারুল আলমকে দুই বছরের চুক্তিভিত্তিক আইজিপি নিযুক্ত করে।
বাহারুল আলমের দায়িত্ব গ্রহণের প্রায় এক বছর পরে, ডিসেম্বর মাসে পিলখানা হত্যাকাণ্ডের তদন্তে তার ভূমিকা নিয়ে সমালোচনা বাড়ে। পিলখানা হত্যাকাণ্ডের সময় তিনি বিশেষ শাখার (এসবি) প্রধান ছিলেন এবং তদন্তে জাতীয় স্বাধীন তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। এই প্রতিবেদন ও তদন্তের ফলাফল নিয়ে জনমত ও মানবাধিকার সংগঠনগুলো আইজিপির কাছ থেকে পদত্যাগের দাবি জানায়।
বাহারুল আলমের মতে, তদন্ত কমিশন ইতিমধ্যে বিষয়টি তদন্ত করেছে এবং এখন সরকার কী সিদ্ধান্ত নেবে তা নির্ধারিত হবে। তিনি বলেন, “এখানে আমার দেখার বা বলার কিছু নেই, সরকারই শেষ সিদ্ধান্ত নেবে।” তার এই মন্তব্য গুজবের বিরোধী দিককে জোরদার করে এবং তার অবস্থানকে স্পষ্ট করে।
পদত্যাগের গুঞ্জন ও আইজিপি প্রত্যাখ্যানের মধ্যে রাজনৈতিক বিশ্লেষণ না করে, বর্তমান পরিস্থিতি দেখায় যে বাংলাদেশ সরকারের নিরাপত্তা নীতি ও পুলিশ নেতৃত্বের স্থিতিশীলতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। সরকার যদি আইজিপি পদে পরিবর্তন না করে, তবে ভবিষ্যতে নিরাপত্তা সংস্থার স্বায়ত্তশাসন ও রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের বিষয়ে আরও তীব্র আলোচনা হতে পারে। অন্যদিকে, যদি সরকার নতুন পদক্ষেপ গ্রহণ করে, তবে তা রাজনৈতিক গঠন ও নিরাপত্তা কাঠামোর মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
এই ঘটনায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও পুলিশ সদর দপ্তরের অভ্যন্তরীণ মতবিরোধ স্পষ্ট হয়ে ওঠে, যা সরকারকে আইজিপি নির্বাচন প্রক্রিয়া ও তার স্বচ্ছতা সম্পর্কে পুনর্বিবেচনা করতে বাধ্য করতে পারে। গুজবের উত্স ও তার প্রভাব সম্পর্কে স্পষ্ট তথ্য না থাকলেও, এই বিতর্কের ফলে বাংলাদেশ পুলিশের নেতৃত্বে জনসাধারণের আস্থা ও সরকারের নিরাপত্তা নীতি উভয়ই পরীক্ষা করা হবে।
অবশেষে, বাহারুল আলমের পদত্যাগের গুঞ্জন ও তার প্রত্যাখ্যানের পরিণতি দেশের রাজনৈতিক পরিবেশে কীভাবে প্রভাব ফেলবে তা সময়ই নির্ধারণ করবে। সরকার যদি এই বিষয়টি সমাধান করে, তবে নিরাপত্তা সংস্থার নেতৃত্বে স্থিতিশীলতা বজায় থাকবে এবং রাজনৈতিক অস্থিরতা কমে যাবে। অন্যথায়, গুজবের পুনরাবৃত্তি ও নিরাপত্তা সংস্থার নেতৃত্বে অনিশ্চয়তা দেশের সামগ্রিক শাসনব্যবস্থার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।



