হোয়াইট হাউসে অনুষ্ঠিত সাম্প্রতিক বৈঠকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইজরায়েলি সরকারের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ইরানের চীনে তেল রফতানি সীমিত করার জন্য “সর্বোচ্চ চাপ” প্রয়োগের ওপর একমত হন। উভয় নেতা যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা ও মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতা রক্ষার জন্য ইরানের তেল রপ্তানি হ্রাসকে গুরুত্বপূর্ণ কৌশল হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। এই সিদ্ধান্তের পেছনে ইরানের পারমাণবিক কার্যক্রমের প্রতি মার্কিন সরকারের উদ্বেগ এবং চীনের সঙ্গে তার বাণিজ্যিক সম্পর্কের সম্ভাব্য প্রভাব রয়েছে।
বৈঠকে উপস্থিত দুই মার্কিন কর্মকর্তার মতে, ইরানের তেল রপ্তানি চীনে কমাতে আন্তর্জাতিক সমন্বয় প্রয়োজন এবং মার্কিন সরকার এই লক্ষ্যে সর্বোচ্চ চাপ প্রয়োগ করবে। তারা উল্লেখ করেছেন, “ইরানের উপর সর্বোচ্চ চাপ আরোপ করা হবে, বিশেষত চীনে তেল রফতানি বিষয়ে”। এই মন্তব্যগুলো বৈঠকের পর প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে উল্লেখিত হয়েছে, যা বৈঠকের মূল বিষয়বস্তুকে স্পষ্ট করে।
মার্কিন সরকার ইরানের তেল রপ্তানি চীনে কমাতে বিভিন্ন কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক উপায় ব্যবহার করার পরিকল্পনা করেছে। এর মধ্যে তৃতীয় পক্ষের দেশগুলোর ওপর চাপ আরোপ, আর্থিক লেনদেনের সীমাবদ্ধতা এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য নীতিমালার পুনর্বিবেচনা অন্তর্ভুক্ত হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য হল ইরানের তেল আয়ের প্রবাহকে হ্রাস করে তার পারমাণবিক প্রকল্পের অর্থায়ন সীমিত করা।
চীনের পক্ষ থেকে ইরানের ওপর একতরফা নিষেধাজ্ঞা আরোপের বিরোধিতা করা হয়েছে। চীন স্পষ্টভাবে জানিয়েছে যে তেহরানের সঙ্গে তাদের বাণিজ্যিক লেনদেন আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী বৈধ এবং কোনো একতরফা নিষেধাজ্ঞা স্বীকৃত নয়। চীনের এই অবস্থান ইরানের তেল রপ্তানির ওপর যুক্তরাষ্ট্রের চাপকে জটিল করে তুলেছে এবং দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্যিক টানাপোড়েন বাড়িয়ে দিয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা উল্লেখ করেন, চীনে তেল রফতানি কমলে ইরানের অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্য প্রভাব পড়বে এবং তার পারমাণবিক নীতি পরিবর্তনের সম্ভাবনা বাড়বে। তবে একই সঙ্গে, চীন ও ইরানের বাণিজ্যিক সম্পর্কের গভীরতা বিবেচনা করলে, যুক্তরাষ্ট্রের চাপের কার্যকারিতা সীমিত হতে পারে। এই পরিস্থিতি আন্তর্জাতিক শক্তি সমন্বয়ের নতুন চ্যালেঞ্জ উপস্থাপন করছে।
ইরানের পারমাণবিক প্রকল্প নিয়ে মার্কিন সরকারের অবস্থান কঠোর। যুক্তরাষ্ট্র ইরানকে পারমাণবিক চুক্তিতে স্বাক্ষর করতে চায়, যেখানে পারমাণবিক অস্ত্রের বিকাশ নিষিদ্ধ থাকবে। ইরানের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, তারা চুক্তিতে স্বাক্ষর করতে ইচ্ছুক তবে তা তাদের শর্তে হবে এবং কোনো একতরফা চাপে তারা বাধ্য হবে না। উভয় পক্ষের এই পারস্পরিক অগ্রাধিকারের পার্থক্য আলোচনার জটিলতা বাড়িয়ে তুলেছে।
সামরিক দৃষ্টিকোণ থেকে মার্কিন সরকার পারস্য উপসাগরে তার উপস্থিতি বাড়িয়ে তুলেছে। বর্তমানে মার্কিন নৌবাহিনীর ক্যারিয়ার জাহাজ “আব্রাহাম লিঙ্কন” এই অঞ্চলে মোতায়েন রয়েছে এবং আরেকটি ক্যারিয়ার জাহাজ “জেরাল্ড আর ফোর্ড” ক্যারিবিয়ান থেকে পশ্চিম এশিয়ায় স্থানান্তরিত হচ্ছে। এই পদক্ষেপগুলো ইরানের সম্ভাব্য সামরিক হুমকির মোকাবিলার জন্য কৌশলগত প্রস্তুতি হিসেবে ব্যাখ্যা করা হচ্ছে।
ইরান এই সামরিক পদক্ষেপকে সরাসরি যুদ্ধের হুমকি হিসেবে দেখেছে। তেহরানের মুখপাত্র জানিয়েছেন, যদি মার্কিন সরকার কোনো সামরিক অভিযান শুরু করে, তা ইরানের দৃষ্টিতে যুদ্ধের সমতুল্য হবে এবং তারা যথাযথ প্রতিক্রিয়া জানাবে। এই বিবৃতি ইরানের নিরাপত্তা নীতির দৃঢ়তা প্রকাশ করে এবং যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক পরিকল্পনার সম্ভাব্য ঝুঁকি তুলে ধরে।
সাম্প্রতিক সময়ে ওমানের মাধ্যমে ইরান ও মার্কিন সরকারের মধ্যে একবারের জন্য আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়েছে। যদিও বিস্তারিত প্রকাশিত হয়নি, উভয় পক্ষের মধ্যে সংলাপের সূচনা ভবিষ্যতে কূটনৈতিক সমাধানের সম্ভাবনা নির্দেশ করে। তবে তীব্র চাপ ও সামরিক প্রস্তুতির সমান্তরালে এই ধরনের আলোচনা কতটুকু কার্যকর হবে তা এখনও অনিশ্চিত।
পরবর্তী সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের তেল রপ্তানি সীমিত করার কৌশল কীভাবে বাস্তবায়িত হবে এবং চীন কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানাবে, তা আন্তর্জাতিক সম্পর্কের দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ হবে। একই সঙ্গে, ইরানের পারমাণবিক আলোচনার অগ্রগতি এবং অঞ্চলের সামরিক ভারসাম্য বজায় রাখতে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা কতটা কার্যকর হবে, তা বিশ্ব নিরাপত্তার জন্য মূল সূচক হয়ে দাঁড়াবে।



