বাংলাদেশের জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি সাম্প্রতিক জাতীয় নির্বাচনে জয়লাভের পর দেশীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নতুন কূটনৈতিক গতিপথ গড়ে তুলেছে। ৪৯৯টি আসনে অধিকাংশ জয় অর্জনকারী দলটি ঢাকার শাসন পরিবর্তনের সংকেত দিয়েছে, যা দক্ষিণ এশিয়ার দুই বৃহৎ প্রতিবেশীর মধ্যে সম্পর্কের পুনর্মূল্যায়নের প্রয়োজনীয়তা বাড়িয়ে তুলেছে। বিশ্লেষকরা দাবি করছেন, এই প্রেক্ষাপটে ভারতের উদ্যোগে দ্বিপাক্ষিক আলোচনার সূচনা করা উচিৎ।
বিএনপি জয়ের পর দিল্লি সরকার বাংলাদেশকে অভিনন্দন জানিয়ে ইতিবাচক সুর প্রকাশ করলেও, দুই দেশের মধ্যে অবশিষ্ট অবিশ্বাসের ফাঁক এখনও বিদ্যমান। সীমান্তে ঘটমান হত্যাকাণ্ড, পানির ভাগাভাগি নিয়ে বিরোধ, বাণিজ্যিক বাধা এবং রাজনৈতিক মন্তব্যের ধারাবাহিকতা সম্পর্ককে জটিল করে তুলেছে। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক অস্থিরতার পর থেকে এই সমস্যাগুলি ধীরে ধীরে তীব্রতর হয়েছে।
সীমান্তে গুলিবর্ষণ, নদীর জলের বণ্টন নিয়ে বিরোধ এবং বাণিজ্যিক নীতির পার্থক্য দু’দেশের মধ্যে উত্তেজনা বাড়িয়ে দিয়েছে। পাশাপাশি, ভারতীয় রাজনৈতিক মঞ্চ ও টেলিভিশনে বাংলাদেশকে লক্ষ্য করে উসকানিমূলক মন্তব্যের ধারাবাহিকতা ঢাকায় এমন ধারণা তৈরি করেছে যে, দিল্লি দেশের সার্বভৌমত্বকে সমান মর্যাদা দেয় না।
দিল্লি-ঢাকা সংযোগের বাস্তবিক দিকেও অবনতি দেখা যাচ্ছে। ভিসা সেবার সীমাবদ্ধতা, স্থলপথে চলাচলের হ্রাস এবং সরাসরি বিমান সেবার কমে যাওয়া দু’দেশের নাগরিক ও ব্যবসায়িক সংযোগকে প্রভাবিত করছে। এই ধীরগতি কূটনৈতিক সম্পর্কের পুনরুজ্জীবনের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
তবু, দুই দেশের পারস্পরিক নির্ভরতা অস্বীকার করা যায় না। প্রায় ৪,৯৬০ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্ত, নিরাপত্তা সহযোগিতা এবং সাংস্কৃতিক বিনিময় এমন ক্ষেত্র যেখানে বিচ্ছিন্নতা সম্ভব নয়। ভারতের সঙ্গে বাণিজ্যিক লেনদেনের পরিমাণে বাংলাদেশ সর্বোচ্চ, আর ভারতের বাজারে বাংলাদেশের রফতানি সর্ববৃহৎ, যা উভয় দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
এই বাস্তবতা বিবিসি রিপোর্টে তুলে ধরা হয়েছে এবং কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা একমত যে, বর্তমান দূরত্ব টেকসই নয়; কৌশলগত পুনর্গঠন প্রয়োজন। বিশেষ করে, প্রথম পদক্ষেপ নেওয়ার দায়িত্ব বড় প্রতিবেশী হিসেবে ভারতের উপর থাকা উচিত, এ বিষয়ে বেশ কয়েকজন বিশেষজ্ঞের মতামত সমর্থন পেয়েছে।
ওপি জিন্দাল গ্লোবাল ইউনিভার্সিটির আন্তর্জাতিক বিষয়ক অধ্যাপক শ্রীরাধা দত্তের মতে, ভারতের উচিত সক্রিয়ভাবে সংলাপের সূচনা করা এবং বাংলাদেশকে সহযোগিতার ক্ষেত্রগুলো চিহ্নিত করতে সহায়তা করা। তিনি জোর দিয়ে বলেন, নতুন নির্বাচনের পর বাংলাদেশ শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে এবং উভয় পক্ষের জন্য পারস্পরিক লাভজনক সহযোগিতা সম্ভব।
লন্ডনের এসওএএস ইউনিভার্সিটির রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অধ্যাপক অবিনাশ পালিওয়ালের বিশ্লেষণও একই দিক নির্দেশ করে। তিনি উল্লেখ করেন, অতীতের ভারত-বিএনপি সম্পর্ক জটিল এবং অবিশ্বাসের ছাপ রেখে গিয়েছিল, তবে বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি পরিবর্তনশীল। তারেক রহমানের মতো রাজনৈতিক নেতারা অতীতকে বাধা না হয়ে ভবিষ্যতের দিকে দৃষ্টিপাত করছেন, যা রাজনৈতিক পরিপক্কতার ইঙ্গিত দেয়। দিল্লি সরকারও বাস্তববাদী সম্পৃক্ততার ইচ্ছা প্রকাশ করেছে, যা ইতিবাচক সংকেত হিসেবে বিবেচিত।
সারসংক্ষেপে, দু’দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের নতুন স্বাভাবিকতা গড়ে তুলতে কৌশলগত পুনর্গঠন এবং পারস্পরিক আস্থা পুনর্স্থাপন অপরিহার্য। বিশ্লেষকরা একমত যে, প্রথম পদক্ষেপের দায়িত্ব ভারতের ওপর, এবং সক্রিয় সংলাপের মাধ্যমে সীমান্ত নিরাপত্তা, পানির ভাগাভাগি, বাণিজ্যিক বাধা ও ভিসা সেবার উন্নতি সম্ভব হবে। ভবিষ্যতে উভয় দেশের রাজনৈতিক পরিপক্কতা এবং বাস্তববাদী নীতি এই সম্পর্ককে স্থিতিশীল ও সমৃদ্ধিশালী করে তুলতে মূল ভূমিকা রাখবে।



