রবিবার সকাল প্রায় ৯ টার দিকে সিরাজগঞ্জের বিয়ারাঘাট এলাকায় একটি পাবলিক বাসের ধাক্কায় ৩১ বছর বয়সী গৃহবধূ আঁখি খাতুনের মৃত্যু ঘটেছে। তিনি মাদ্রাসা থেকে বেরিয়ে বাড়ি ফেরার পথে ছিলেন, যখন ঢাকা-সিরাজগঞ্জ সংযোগকারী এসআই (সাপ্লাই) বাসটি তার গাড়িকে আঘাত করে। গাড়ি চালকের তৎক্ষণাৎ সহায়তা সত্ত্বেও, আহতের শ্বাস বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তিনি স্থানীয় হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই মৃত্যুবরণ করেন। ঘটনাস্থলে উপস্থিত কয়েকজন পথচারী জানান, বাসটি দ্রুত গতি বজায় রেখে গাড়ির সঙ্গে ধাক্কা মারার পর থামেনি, ফলে ট্রাফিক জ্যাম এবং অতিরিক্ত ঝুঁকি সৃষ্টি হয়।
আঁখি খাতুন সিরাজগঞ্জের জুবলী রোডে অবস্থিত ‘ফুড কেয়ার হোটেল’এর মালিক ফারুক হোসেনের স্ত্রী। তার পরিবার জানিয়েছে, তিনি সম্প্রতি মাদ্রাসায় ধর্মীয় শিক্ষা গ্রহণের জন্য সময় কাটাচ্ছিলেন, যদিও গৃহস্থালির কাজকর্মে তিনি সক্রিয় ছিলেন। মৃত্যুর পর তার দেহ স্বজনদের হাতে নিয়ে গৃহে নিয়ে যাওয়া হয়েছে এবং শোককাল পালন করা হচ্ছে। পরিবার জানান, তিনি পরিবারের আর্থিক ও সামাজিক দায়িত্বে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতেন।
সিরাজগঞ্জ সদর থানার ওসি শহিদুল ইসলাম ঘটনাস্থলে পৌঁছে বিস্তারিত জানিয়েছেন। তিনি উল্লেখ করেন, “মাদ্রাসা থেকে বেরিয়ে বাড়ি ফেরার পথে, সিরাজগঞ্জ থেকে ঢাকায় যাওয়া এসআই বাসটি আঁখি খাতুনের গাড়িকে ধাক্কা দেয়; ফলে ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু ঘটে।” ওসি আরও জানান, বাসটি ধাক্কা মারার পরও তৎক্ষণাৎ থামেনি, যা ট্রাফিক নিরাপত্তা বিধি লঙ্ঘনের স্পষ্ট উদাহরণ। তিনি জানান, ঘটনাস্থলে রেকর্ডেড ভিডিও এবং গাড়ির ড্রাইভারের লাইসেন্সসহ অন্যান্য প্রমাণ সংগ্রহ করা হয়েছে।
দুর্ঘটনা ঘটার সঙ্গে সঙ্গে স্থানীয় বাসিন্দারা রাস্তায় সমাবেশ করে প্রতিবাদ শুরু করেন। মালশাপাড়া‑মুলিবাড়ি সড়ক অবরোধ করে তারা বাস চালকের নিরাপত্তা অবহেলা এবং গৃহবধূের মৃত্যুর জন্য দায়িত্ব দাবি করেন। প্রতিবাদকারীরা স্থানীয় প্রশাসনকে দ্রুত তদন্ত, দায়িত্বশীলদের শাস্তি এবং সড়ক নিরাপত্তা ব্যবস্থার কঠোর প্রয়োগের আহ্বান জানায়। কিছু সময়ের জন্য সড়কটি সম্পূর্ণভাবে বন্ধ ছিল, ফলে স্থানীয় ব্যবসা ও যাতায়াতে ব্যাঘাত ঘটেছিল।
প্রতিবাদে গৃহীত পদক্ষেপের পর পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। যমুনা সেতু পশ্চিম থানা পুলিশ বাসটি এবং চালককে গ্রেফতার করে। গ্রেফতারকৃত চালক শহরের সয়াধানগড়া এলাকার আশরাফুল ইসলাম, যাকে এখন তদন্তাধীন রাখা হয়েছে। গ্রেফতারকৃত ব্যক্তিকে স্থানীয় জেলখানায় স্থানান্তর করা হয়েছে এবং তার বিরুদ্ধে প্রাথমিক শংসাপত্র জারি করা হয়েছে।
অধিক তদন্তের জন্য পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে ভিডিও রেকর্ড, গাড়ির ড্রাইভার লাইসেন্স এবং বাসের রেজিস্ট্রেশন সনদ সংগ্রহ করেছে। ওসি শহিদুল ইসলাম জানিয়েছেন, “যদি কোনো আইনগত লঙ্ঘন প্রমাণিত হয়, তবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে যথাযথ শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।” তিনি আরও উল্লেখ করেন, মৃতের স্বজনদের সঙ্গে সমন্বয় করে দেহের শেষিকরণ এবং শোককালের প্রয়োজনীয়তা পূরণ করা হবে। বর্তমানে পুলিশ দুর্ঘটনার সুনির্দিষ্ট কারণ নির্ণয়ের জন্য ট্রাফিক ক্যামেরা ফুটেজ এবং গাড়ির টেকনিক্যাল পরীক্ষা চালিয়ে যাচ্ছে।
এই ঘটনার পর স্থানীয় আদালতে মামলার রেজিস্ট্রেশন এবং প্রমাণ সংগ্রহের কাজ শুরু হয়েছে। সংশ্লিষ্ট আইনজীবীরা জানিয়েছেন, বাস চালকের অপরাধমূলক দায়িত্ব এবং গৃহবধূের মৃত্যুর জন্য দায়িত্ব নির্ধারণে ট্রাফিক আইন, সড়ক নিরাপত্তা বিধি এবং দায়িত্বশীলতা সংক্রান্ত ধারা প্রয়োগ করা হবে। আদালত প্রাথমিক শোনানিতে চালকের বিরুদ্ধে ‘সড়ক দুর্ঘটনা’ এবং ‘অবহেলাজনিত মৃত্যুর’ অভিযোগ আনা হতে পারে, যা অনুযায়ী শাস্তি সর্বোচ্চ ১০ বছর পর্যন্ত হতে পারে।
সিরাজগঞ্জে সাম্প্রতিক সময়ে সড়ক নিরাপত্তা সংক্রান্ত অভিযোগ বাড়ছে। স্থানীয় নাগরিক ও মানবাধিকার সংগঠনগুলো এই ধরনের দুর্ঘটনা রোধে কঠোর ট্রাফিক নিয়মের প্রয়োগ, পাবলিক ট্রান্সপোর্টের নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ এবং চালকদের প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা শক্তিশালী করার দাবি করছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক মন্তব্য পাওয়া যায়নি, তবে তদন্ত চলমান রয়েছে এবং ভবিষ্যতে নিরাপত্তা ব্যবস্থার উন্নয়ন নিয়ে আলোচনা



