ঢাকা ও দেশের অন্যান্য শহরে ব্যাটারি চালিত অটো রিকশার সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে, তবে এই গতি চালকদের স্বাস্থ্যের ওপর গোপন ঝুঁকি তৈরি করছে। দুই বছর ধরে এই ধরণের রিকশা চালিয়ে আসা ২৬ বছর বয়সী জাকির হোসেন জানান, দীর্ঘ সময় গাড়িতে বসে কাজ করার ফলে তার জয়েন্টে ব্যথা অনুভব হয়।
রিকশা, ভ্যান ও ইজি বাইক শ্রমিক ইউনিয়নের অনুমান অনুযায়ী, দেশে মোট প্রায় সাত মিলিয়ন ব্যাটারি চালিত রিকশা চলাচল করছে, যার মধ্যে এক মিলিয়নই ঢাকার সড়কে দেখা যায়। এই গাড়িগুলি হালকা ফ্রেম ও মৌলিক ব্রেক দিয়ে তৈরি, তবু বেশিরভাগই ৪০ কিলোমিটার প্রতি ঘণ্টা পর্যন্ত গতি অর্জন করতে সক্ষম, যা তাদের নকশার সীমা অতিক্রম করে।
গতি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে রিকশার স্থিতিশীলতা কমে যায়, ফলে চালকদের দেহে অতিরিক্ত কম্পন ও ধাক্কা লাগে। বিশেষ করে অসমতল সড়ক ও গর্তে দ্রুত চলার সময় এই কম্পন তীব্র হয়, যা দীর্ঘ সময় বসে থাকা অবস্থায় পেশী ও হাড়ের উপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে।
অনেক চালক দরিদ্রতা, অপুষ্টি ও ভারী শারীরিক শ্রমের পর এই পেশায় প্রবেশ করেন। তাদের শারীরিক অবস্থা ইতিমধ্যে দুর্বল হওয়ায়, দীর্ঘ সময় অস্বস্তিকর আসনে বসে কাজ করা আরও ক্ষতি করে। ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক আরিফুল ইসলাম নাদিম উল্লেখ করেন, রিকশা চালকদের শারীরিক স্বাস্থ্যের কথা নকশার পর্যায়ে পর্যাপ্তভাবে বিবেচনা করা হয় না।
চিকিৎসা গবেষণায় দেখা গেছে, দীর্ঘ সময় বসে থাকা, ক্রমাগত কম্পন এবং অপ্রতুল সিটের নকশা মসকুলোস্কেলেটাল রোগের ঝুঁকি বাড়ায়। বিশেষ করে গলা ও নিম্ন পিঠে ব্যথা, জয়েন্টে অস্বস্তি এবং দীর্ঘ সময়ের পর পেশীর ক্লান্তি সাধারণ লক্ষণ। এই সমস্যাগুলি কেবল অস্বস্তি নয়, দৈনন্দিন কাজকর্মেও বাধা সৃষ্টি করে; অনেক চালক ভারী মাল তুলতে বা দীর্ঘ দূরত্বে হাঁটতে সমস্যার মুখোমুখি হন।
বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এই শারীরিক চাপের ফলে স্পাইনাল সমস্যার সম্ভাবনা বাড়ে, বিশেষ করে দীর্ঘ সময় রিকশা চালিয়ে আসা পুরনো চালকদের মধ্যে পিঠের বাঁক বা ভঙ্গি বিকৃতি দেখা যায়। দীর্ঘমেয়াদী চাপের ফলে ডিজেনারেটিভ ডিস্ক রোগ ও আর্থ্রাইটিসের ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়, যা কর্মক্ষমতা হ্রাসের পাশাপাশি চিকিৎসা ব্যয় বাড়ায়।
সড়ক নিরাপত্তা, ট্র্যাফিক জ্যাম ও পরিবেশগত প্রভাব নিয়ে জনসাধারণের আলোচনায় রিকশা চালকদের শারীরিক স্বাস্থ্যের বিষয়টি প্রায়শই উপেক্ষিত থাকে। যদিও গতি ও দূষণ হ্রাসের দিক থেকে ব্যাটারি রিকশা প্রশংসিত হয়, তবে চালকদের দীর্ঘ সময়ের কাজের শর্তে সৃষ্ট স্বাস্থ্যঝুঁকি সমাধান না করলে এই সুবিধা নষ্ট হতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা পরামর্শ দেন, রিকশার আসন ও সাসপেনশন সিস্টেমকে আরও আরামদায়ক ও এর্গোনোমিক করা দরকার। এছাড়া নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা, কাজের সময় সীমা নির্ধারণ এবং শারীরিক ব্যায়াম ও স্ট্রেচিংয়ের প্রশিক্ষণ চালকদের জন্য অপরিহার্য। সরকার ও শ্রমিক ইউনিয়নকে একসাথে কাজ করে নিরাপদ কর্মপরিবেশ গড়ে তোলার জন্য নীতি নির্ধারণে মনোযোগ দিতে হবে।
অবশেষে, রিকশা চালকদের স্বাস্থ্যের প্রতি মনোযোগ বাড়িয়ে, উপযুক্ত যন্ত্রপাতি ও স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব। এভাবে ব্যাটারি চালিত রিকশা পরিবহন ব্যবস্থার সুবিধা বজায় রেখে চালকদের দীর্ঘমেয়াদী শারীরিক স্বাস্থ্যের সুরক্ষা নিশ্চিত করা যাবে।



