অমর একুশে বই মেলায় অংশগ্রহণের ব্যাপারে প্রধান প্রকাশক গোষ্ঠী একত্রে সিদ্ধান্ত নিয়েছে মেলা থেকে বিরত থাকা, এবং মেলাটি ঈদ‑উল‑ফিতরের পর পর্যন্ত স্থগিত করার দাবি জানিয়েছে। এই সিদ্ধান্তের পেছনে নির্বাচনের পরবর্তী অস্থিরতা এবং রমজান মাসের সঙ্গে মেলাটির সময়সীমা ওভারল্যাপের উদ্বেগ রয়েছে, যা বাজারের আয়‑ব্যয় ভারসাম্যকে প্রভাবিত করতে পারে।
মেলায় মোট ৩৭টি প্রকাশককে প্যাভিলিয়ন বরাদ্দ করা হয়, যার মধ্যে ৩৬টি প্রকাশক এখনো অংশ না নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। প্যাভিলিয়ন পাওয়া প্রকাশকদের মধ্যে UPL, Mawla Brothers, Ananya Prokashoni এবং Onno Prokash উল্লেখযোগ্যভাবে অংশ না নেওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেছে, আর একমাত্র অবশিষ্ট প্রকাশক এখনও অংশগ্রহণের সম্ভাবনা বিবেচনা করছে।
২৮ ফেব্রুয়ারি প্রকাশকদের সমন্বয়ে একটি যৌথ বিবৃতি প্রকাশিত হয়, যেখানে ৩২১টি প্রকাশক মেলাটির উদ্বোধনকে ঈদ‑উল‑ফিতরের পরের প্রথম রবিবারে স্থানান্তর করার আহ্বান জানায়। বিবৃতিতে মেলার আয়‑ব্যয় ভারসাম্য রক্ষার জন্য সময়সূচি পরিবর্তনের জরুরি প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা হয়েছে।
গতকাল একই সময়ে ১৪টি প্রকাশক একটি উন্মুক্ত চিঠি পাঠিয়ে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের কাছে একই দাবি পুনরায় উপস্থাপন করে। চিঠিতে মেলার সময়সূচি পরিবর্তনের মাধ্যমে বিক্রয় ও দর্শকসংখ্যা রক্ষা করার প্রয়োজনীয়তা এবং সম্ভাব্য আর্থিক ক্ষতি কমানোর কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
বই মেলার প্যাভিলিয়ন ও স্টল বরাদ্দ নিশ্চিত করতে বাংলা একাডেমী ৯ ফেব্রুয়ারি থেকে ১১ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত পেমেন্টের শেষ তারিখ বাড়িয়ে দেয়। তবে সূত্র অনুযায়ী এখনও বেশিরভাগ প্রকাশকের পেমেন্ট জমা হয়নি, যা প্যাভিলিয়ন হারানোর ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে।
প্রকাশক গোষ্ঠী জাতীয় নির্বাচনের পর সম্ভাব্য অস্থিরতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে, যা মেলার নিরাপত্তা ব্যবস্থা বাড়াতে পারে এবং অতিরিক্ত খরচের সম্ভাবনা তৈরি করে। এই অস্থিরতা বিক্রয় পূর্বাভাসকে নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত করছে।
Ananya Prokashoni‑এর মনিরুল হক উল্লেখ করেন, সংসদীয় ভোটের পর পরিস্থিতি অনিশ্চিত থাকায় মেলার আয় ও অংশগ্রহণের হার হ্রাস পেতে পারে। অনিশ্চয়তা প্রকাশকদের আর্থিক পরিকল্পনাকে কঠিন করে তুলেছে।
রমজান ১৭ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়ার কথা, ফলে ইফতার, ত্রাওয়াহ ও অন্যান্য ধর্মীয় কার্যক্রমের সঙ্গে মেলার দর্শকসংখ্যা কমে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। সন্ধ্যা সময়ে মানুষ প্রধানত ঘরে থাকে, ফলে মেলার বিক্রয় শীর্ষ সময় হ্রাস পায়। প্রকাশকরা এই সময়ে বিক্রয় হ্রাসের ঝুঁকি উল্লেখ করছেন।
Onno Prokash‑এর মজহারুল ইসলাম বলেন, রমজান মাসে মেলায় উপস্থিতি স্বাভাবিকভাবেই কমে যাবে এবং তা বিক্রয় আয়কে প্রভাবিত করবে। কম ভিজিটরের ফলে স্টল ভাড়া ও বিজ্ঞাপন আয়ও হ্রাস পাবে।
বই মেলার প্রধান দর্শকগোষ্ঠী ছাত্রছাত্রী, যারা অনেক সময় স্টলে পার্ট‑টাইম কাজ করে, তাদের উপস্থিতি ইদের পূর্বে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হওয়ায় হ্রাস পাবে বলে অনুমান করা হচ্ছে। ছাত্রদের অংশগ্রহণ হ্রাস মেলার সামগ্রিক বিক্রয়কে প্রভাবিত করবে।
ফাস্টিং চলাকালীন স্টল কর্মীদের কাজের দক্ষতা ও সেবা মান বজায় রাখার প্রশ্নও উত্থাপিত হয়েছে, যা মেলার সামগ্রিক কার্যকারিতায় প্রভাব ফেলতে পারে। কর্মীদের স্বাস্থ্য রক্ষার জন্য অতিরিক্ত ব্যবস্থা প্রয়োজন হতে পারে।
যদি অমর একুশে বই মেলা ঐতিহ্যগতভাবে ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত হয়, তবে পরবর্তী তিনটি সংস্করণও রমজান মাসে অনুষ্ঠিত হবে, যা বাজারের চাহিদা ও বিক্রয় প্রবণতাকে দীর্ঘমেয়াদে প্রভাবিত করতে পারে। প্রকাশকরা বিকল্প মেলা বা অনলাইন বিক্রয় চ্যানেল বিবেচনা করতে পারে।
প্রকাশক গোষ্ঠীর এই সমন্বিত পদক্ষেপ বই বাজারে বিক্রয় হ্রাস, স্টল ভাড়া হ্রাস এবং বিজ্ঞাপন আয়ের সম্ভাব্য ক্ষতি সৃষ্টি করতে পারে, ফলে মেলার আয়‑ব্যয় সমতা পুনর্বিবেচনা করা জরুরি। এই পরিস্থিতি প্রকাশকদের আর্থিক পরিকল্পনা ও প্রকাশনা ক্যালেন্ডারকে পুনর্গঠন করতে বাধ্য করবে।



