ঢাকা ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে ৯ ফেব্রুয়ারি স্বাক্ষরিত পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তি গার্মেন্টস শিল্পের জন্য নতুন করের শর্ত নিয়ে প্রশ্ন উত্থাপন করেছে। চুক্তি স্বাক্ষরের পর তাৎক্ষণিকভাবে কূটনৈতিক সাফল্য হিসেবে স্বীকৃত হলেও, “কটন ক্লজ” নামে পরিচিত ধারা নিয়ে শিল্পে বিভ্রান্তি দেখা দিচ্ছে।
বাংলাদেশের গার্মেন্টস খাত মোট রপ্তানি পণ্যের ৮৬ শতাংশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বিক্রি হয়; তাই এই চুক্তির কোনো অনিশ্চয়তা সরাসরি রপ্তানি আয়কে প্রভাবিত করতে পারে। নতুন শর্তে বাংলাদেশকে ১৯ শতাংশ পারস্পরিক শুল্কের পাশাপাশি বিদ্যমান সর্বোত্তম জাতি (MFN) শুল্ক প্রায় ১৬.৫০ শতাংশ দিতে হবে। কোনো ছাড় না থাকলে মোট শুল্কের হার ৩৫.৫ শতাংশে পৌঁছায়।
বাণিজ্য বিষয়ক উপদেষ্টা স্ক বশির উদ্দিন ১০ ফেব্রুয়ারি একটি সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছেন যে, যুক্তরাষ্ট্রের কটন বা কৃত্রিম ফাইবার ব্যবহার করলে পারস্পরিক শুল্ক মওকুফ হবে। তবে তিনি উল্লেখ করেছেন যে এই ছাড় শুধুমাত্র নির্দিষ্ট শর্তে প্রযোজ্য হবে এবং অন্যান্য শুল্কের ওপর কোনো প্রভাব থাকবে না।
শিল্পের প্রতিনিধিরা এই ব্যাখ্যাকে যথেষ্ট নয় বলে সতর্ক করেছেন। বাংলাদেশ গার্মেন্টস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্য এর সভাপতি মাহমুদ হাসান খান উল্লেখ করেন, যুক্তরাষ্ট্রের পূর্বে আরোপিত শুল্ক মওকুফ হবে না। তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, যদি কোনো মার্কিন রিটেইলার বাংলাদেশ থেকে দুই ডলারের একটি টি-শার্ট কেনে, তবে কটন ব্যবহৃত হলে ১৯ শতাংশ পারস্পরিক শুল্ক বাদ পড়বে, তবে ১৬.৫০ শতাংশ মৌলিক শুল্ক এখনও প্রযোজ্য থাকবে।
এই উদাহরণে দেখা যায়, পারস্পরিক শুল্কের মওকুফের পরেও পণ্যের মোট করের বোঝা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে না। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে প্রবেশের খরচ উচ্চই থাকে, যা রপ্তানিকারকদের মুনাফা মার্জিনকে সংকুচিত করতে পারে।
বিশ্লেষকরা আরও বলেন, চুক্তির ধারা ৫.৩-এ “শূন্য পারস্পরিক শুল্ক” ব্যবস্থা তৈরির কথা রয়েছে, তবে তা নির্দিষ্ট পরিমাণের রপ্তানির জন্যই প্রযোজ্য হবে। এই পরিমাণটি যুক্তরাষ্ট্রের কটন ও কৃত্রিম ফাইবারের ব্যবহার মাত্রা নির্ধারণ করবে, যা এখনো স্পষ্টভাবে নির্ধারিত হয়নি।
অস্পষ্ট শব্দচয়ন এবং পরিমাণের অনির্দিষ্টতা রপ্তানিকারকদের জন্য পরিকল্পনা করা কঠিন করে তুলেছে। তারা এখনো জানে না কতটুকু পণ্য শূন্য পারস্পরিক শুল্কের আওতায় আসবে এবং কতটুকু পণ্যে এখনও উচ্চ শুল্কের বোঝা থাকবে।
এই অনিশ্চয়তা গার্মেন্টস শিল্পের মূল্য নির্ধারণে প্রভাব ফেলবে। যদি শুল্কের মোট হার উচ্চই থাকে, তবে রপ্তানিকৃত পণ্যের দাম আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতামূলক না থেকে বিক্রয় হ্রাস পেতে পারে।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের কটন ব্যবহার না করলে পারস্পরিক শুল্কের মওকুফের সুবিধা হারিয়ে যাবে, ফলে রপ্তানিকারকদের কটন সরবরাহ শৃঙ্খলে পরিবর্তন আনতে হবে। এই পরিবর্তন উৎপাদন খরচে অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
শিল্প সংস্থা ও সরকারী কর্মকর্তারা চুক্তির ধারা স্পষ্ট করার জন্য দ্রুত পদক্ষেপের দাবি জানাচ্ছেন। তারা আশা করছেন যে নির্দিষ্ট পরিমাণের সীমা এবং শর্তাবলী প্রকাশিত হলে রপ্তানিকারকরা তাদের ব্যবসায়িক কৌশল পুনর্গঠন করতে পারবে।
সারসংক্ষেপে, নতুন বাণিজ্য চুক্তি গার্মেন্টস শিল্পের জন্য কিছু শুল্কের ছাড়ের সম্ভাবনা এনে দিলেও, কটন ক্লজের অনিশ্চয়তা এবং উচ্চ মৌলিক শুল্কের হার রপ্তানির লাভজনকতা হ্রাসের ঝুঁকি তৈরি করেছে। স্পষ্ট নীতি ও পরিমাণের নির্ধারণ ছাড়া শিল্পের ভবিষ্যৎ প্রবণতা পূর্বাভাস করা কঠিনই থাকবে।



