বিএনপি ২০২৬ সালের সাধারণ নির্বাচনে বিশাল সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে, ফলে দেশের রাজনৈতিক মানচিত্রে নতুন পরিবর্তন দেখা যায়। নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার পরই দিল্লি সরকার একটি সংযত স্বর বজায় রেখে প্রতিক্রিয়া জানায়। নরেন্দ্র মোদি বাংলা ভাষায় একটি বার্তা প্রকাশ করে, যেখানে তিনি তারেক রহমানকে ‘নির্ধারক জয়’ অর্জনের জন্য অভিনন্দন জানিয়ে, একটি গণতান্ত্রিক, প্রগতিশীল ও অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রতিবেশীকে সমর্থন করার প্রতিশ্রুতি দেন এবং দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে বহুমুখীভাবে শক্তিশালী করার ইচ্ছা প্রকাশ করেন।
মোদের বার্তায় ভবিষ্যৎমুখী সুর স্পষ্ট, তবে সতর্কতা বজায় রাখা হয়েছে। জুলাই ২০২৪-এ তরুণ প্রজন্মের নেতৃত্বে উত্থাপিত প্রতিবাদে শেখ হাসিনা ভারতীয় সীমান্তে আশ্রয় নেওয়ার পর থেকে দু’দেশের সম্পর্ক তীব্রভাবে ক্ষীণ হয়েছে। সেই সময় থেকে পারস্পরিক অবিশ্বাস বাড়ে, এবং আওয়ামী লীগকে নির্বাচনে অংশগ্রহণ থেকে বাদ দেওয়া হয়।
বাংলাদেশের জনমত নরেন্দ্র মোদির নীতিকে সমালোচনা করে, কারণ পূর্বে তিনি শেখ হাসিনার শাসনকে সমর্থন করার অভিযোগে অভিযুক্ত ছিলেন। সীমান্তে গুলিবর্ষণ, জলসম্পদ বিতর্ক, বাণিজ্যিক বাধা এবং উগ্রভাষা সম্পর্কিত অভিযোগগুলো এই বিরোধের ভিত্তি গঠন করে। বর্তমান সময়ে ভিসা সেবা ব্যাপকভাবে স্থগিত, সীমান্ত অতিক্রমকারী ট্রেন ও বাসের চলাচল বন্ধ, এবং ঢাকা-দিল্লি উড়োজাহাজের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।
দিল্লির দৃষ্টিকোণ থেকে প্রশ্নটি আর ‘বিএনপি সরকারকে স্বাগত জানাবো কি না’ নয়, বরং ‘কীভাবে স্বাগত জানাবো’। ভারতের নিরাপত্তা সংক্রান্ত রেডলাইন—আতঙ্কবাদ ও চরমপন্থা মোকাবেলা—রক্ষা করতে হবে, একইসঙ্গে উভয় দেশের মধ্যে উত্তেজনাপূর্ণ ভাষা কমিয়ে আনতে হবে, যা বাংলাদেশকে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক আলোচনার বিষয়বস্তুতে পরিণত করেছে।
বিশ্লেষকরা বলেন, সম্পর্কের পুনর্স্থাপন সম্ভব, তবে তা সতর্কতা ও পারস্পরিক সমঝোতার ওপর নির্ভরশীল। সোয়াস বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অধ্যাপক অবিনাশ পলিওয়াল উল্লেখ করেন, “বিএনপি, যারা রাজনৈতিকভাবে অভিজ্ঞ ও মধ্যমপন্থী, ভারতের জন্য ভবিষ্যতে নিরাপদ বিকল্প হতে পারে। তবে তারেক রহমান কীভাবে শাসন পরিচালনা করবেন, তা এখনও অনিশ্চিত। তিনি ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক স্থিতিশীল করতে চান, তবে তা সহজ নয়।” এই মন্তব্যে তিনি বর্তমান চ্যালেঞ্জের জটিলতা তুলে ধরেছেন।
ভারতের জন্য বিএনপি কোনো অচেনা দল নয়। ২০০১ সালে খালেদা জিয়া নেতৃত্বে বিএনপি ইসলামিক জামায়াত-ই-ইসলামির সঙ্গে জোট গঠন করে সরকারে ফিরে আসে, তখনই দুই দেশের সম্পর্ক দ্রুত শীতল হয়ে যায়। সেই সময়ের সহযোগিতা সীমিত হয়ে যায়, এবং সীমান্তে নিরাপত্তা উদ্বেগ বাড়ে। তাই, অতীতের অভিজ্ঞতা দিল্লির কূটনৈতিক কৌশলে প্রভাব ফেলবে বলে ধারণা করা যায়।
বর্তমানে, দু’দেশের কূটনৈতিক মঞ্চে পুনরায় সংলাপের দরজা খুলতে হলে উভয় পক্ষেরই রেডলাইনকে সম্মান করতে হবে এবং পারস্পরিক অভিযোগের সমাধানে বাস্তবিক পদক্ষেপ নিতে হবে। বাংলাদেশে নতুন সরকার যদি অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও সামাজিক স্থিতিশীলতার দিকে মনোযোগ দেয়, তবে বাণিজ্যিক বাধা হ্রাস, ভিসা সেবা পুনরায় চালু এবং সীমান্ত সংযোগ পুনরুদ্ধার সম্ভব হতে পারে। একইসঙ্গে, ভারতকে তার সীমান্তে সন্ত্রাসী কার্যক্রমের বিরুদ্ধে কঠোর নীতি বজায় রেখে, উগ্রপন্থী রেটোরিক কমাতে হবে।
সারসংক্ষেপে, বিএনপি জয়োত্তীর্ণের পর ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের পুনর্গঠন একটি সূক্ষ্ম প্রক্রিয়া। নরেন্দ্র মোদির শুভেচ্ছা বার্তা নতুন দৃষ্টিকোণ উন্মোচন করলেও, বাস্তবিক পদক্ষেপের জন্য উভয় দেশের কূটনৈতিক ইচ্ছাশক্তি ও পারস্পরিক স্বার্থের সমন্বয় প্রয়োজন। ভবিষ্যতে সম্পর্কের দিকনির্দেশনা নির্ভর করবে কীভাবে দু’দেশের শাসকগণ রেডলাইনকে সম্মান করে, পারস্পরিক আস্থা গড়ে তোলার জন্য কার্যকর নীতি গ্রহণ করে এবং জনগণের প্রত্যাশা পূরণে সক্ষম হয় তার ওপর।



