মিউনিখে অনুষ্ঠিত ইউরোপের সর্ববৃহৎ নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা সম্মেলনে মার্কো রুবিও, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র সচিব, গুরুত্বপূর্ণ ভাষণ উপস্থাপন করেন। এই অনুষ্ঠানটি ২০২৬ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হয় এবং এতে ইউরোপীয় দেশগুলোর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের দিকনির্দেশনা নিয়ে আলোচনা হয়। রুবিওর বক্তব্যের মূল বিষয় ছিল ইউরোপের সঙ্গে ট্রান্সঅ্যাটলান্টিক বন্ধনের অবস্থা।
সম্মেলনের আয়োজক মিউনিখ সিকিউরিটি কনফারেন্স, প্রতি বছর বিশ্ব নেতাদের একত্রিত করে নিরাপত্তা, প্রতিরক্ষা এবং কূটনৈতিক বিষয়গুলোতে মতবিনিময় করার জন্য পরিচিত। এই বছরেও ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এম্যানুয়েল ম্যাক্রো, জার্মানির চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্জ এবং যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী স্যার কীয়ার স্টার্মার উপস্থিত ছিলেন।
অন্যান্য অংশগ্রহণকারীর মধ্যে জার্মানি, ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের উচ্চপদস্থ রাজনীতিবিদ, সামরিক জেনারেল, নৌবাহিনীর অ্যাডমিরাল, কূটনৈতিক প্রতিনিধি এবং মার্কিন কংগ্রেসের সদস্যরা অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। ইউরোপীয় দেশগুলোর নিরাপত্তা নীতি, সাইবার হুমকি এবং সামরিক সহযোগিতা বিষয়ক সেশনগুলোতে সক্রিয় অংশগ্রহণ লক্ষ্য করা যায়।
সম্মেলনের আগে ইউরোপীয় নেতারা যুক্তরাষ্ট্রের নীতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করছিলেন, বিশেষ করে গত বছর ভিপি জেডি ভ্যান্সের ইউরোপের প্রতি সমালোচনামূলক মন্তব্যের পর। তাই রুবিওর ভাষণকে সকলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত হিসেবে গণ্য করা হয়।
রুবিও প্রথমে যুক্তরাষ্ট্রের কিছু নীতি নিয়ে তীব্র সমালোচনা করেন। তিনি মুক্ত বাণিজ্য, বৃহৎ পরিসরের অভিবাসন এবং জলবায়ু নীতি সম্পর্কে কঠোর মন্তব্য করেন, যা ইউরোপীয় দেশগুলোর দীর্ঘদিনের অগ্রাধিকার।
বিশেষ করে তিনি ‘জলবায়ু সংস্কৃতি’কে এমন এক ধরণের মতবাদ বলে উল্লেখ করেন, যা আমেরিকান অর্থনীতির জন্য ক্ষতিকর। এছাড়া তিনি জাতিসংঘকে গাজা ও ইউক্রেনের সংঘাত সমাধানে ব্যর্থতা নির্দেশ করে সমালোচনা করেন। এই মন্তব্যগুলো শোনার সঙ্গে সঙ্গে হলের কিছু অংশে নীরবতা দেখা যায়।
রুবিওকে সুশৃঙ্খল পোশাক পরিহিত এবং এক হাতে প্যান্টের পকেটের মধ্যে রাখে মঞ্চে দাঁড়িয়ে দেখা যায়। তার ভাষণটি পূর্বনির্ধারিত স্ক্রিপ্টের ওপর ভিত্তি করে ছিল, তবে তিনি মাঝে মাঝে দর্শকদের দিকে চোখ গড়িয়ে কথা বলতেন।
প্রাথমিক সমালোচনার পর রুবিও ধীরে ধীরে সুর পরিবর্তন করেন এবং ইউরোপের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের পারস্পরিক নির্ভরতার ওপর জোর দেন। তিনি উল্লেখ করেন, ‘আমাদের ভাগ্য সর্বদা ইউরোপের সঙ্গে জড়িত থাকবে’ এবং এই সম্পর্কের গুরুত্ব পুনর্ব্যক্ত করেন।
তিনি আরও বলেন, ট্রান্সঅ্যাটলান্টিক যুগের সমাপ্তি কোনো লক্ষ্য নয়, বরং উভয় পক্ষের জন্যই তা অনিচ্ছাকৃত। রুবিও এই কথায় স্পষ্ট করে জানান যে যুক্তরাষ্ট্র ইউরোপের সন্তান হিসেবে নিজেকে বিবেচনা করে।
ইউরোপীয় সংস্কৃতির প্রতি তার প্রশংসা ভাষণের একটি অংশে প্রকাশ পায়। তিনি শেক্সপিয়ার, মজার্ট এবং রোলিং স্টোনসের মতো ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বের উল্লেখ করে ইউরোপের শিল্প ও সঙ্গীতের অবদানের প্রশংসা করেন, যা শ्रोतাদের মধ্যে হালকা হাসি জাগায়।
রুবিও ‘সৃজনশীলতা মুক্ত করা’ এবং গুরুত্বপূর্ণ খনিজের সরবরাহ শৃঙ্খল সুরক্ষায় যৌথ লক্ষ্য নির্ধারণের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন। তিনি যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের মধ্যে প্রযুক্তি, গবেষণা ও উৎপাদন ক্ষেত্রে সহযোগিতা বাড়ানোর আহ্বান জানান।
বক্তব্যের শেষে রুবিও উল্লেখ করেন যে উভয় পক্ষের যৌথ প্রচেষ্টা ভবিষ্যতে নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং পরিবেশ সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। তিনি এই সহযোগিতাকে দীর্ঘমেয়াদী কৌশলগত অংশীদারিত্বের ভিত্তি হিসেবে উপস্থাপন করেন।
রুবিওর সমাপ্তি বক্তব্যের পর হলের মধ্যে ধীরে ধীরে তালি শোনা যায়, যা ইউরোপীয় নেতাদের মধ্যে তার কিছু সুরের প্রতি স্বীকৃতি নির্দেশ করে। যদিও কিছু সমালোচনামূলক অংশ এখনও বিতর্কের বিষয়, তবে অধিকাংশ অংশগ্রহণকারী ভবিষ্যৎ সহযোগিতার সম্ভাবনা নিয়ে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশ করেন।
বিশ্লেষকরা এই ভাষণকে ইউরোপ-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের পুনর্গঠন প্রক্রিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হিসেবে দেখছেন। পরবর্তী সপ্তাহে অনুষ্ঠিত হওয়া দ্বিপাক্ষিক আলোচনায় রুবিওর উল্লেখিত সরবরাহ শৃঙ্খল ও পরিবেশ নীতি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হবে বলে আশা করা হচ্ছে।



