ফিলিপিনার তরুণ পরিচালক রাফায়েল ম্যানুয়েল তার প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘ফিলিপিন্যা’ নিয়ে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে বার্লিন আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে (বেরলিনা) অংশগ্রহণ করেছেন। ছবিটি ফিলিপাইনের ম্যানিলা শহরের বাইরে অবস্থিত এক বিলাসবহুল দেশীয় ক্লাবের পটভূমিতে গড়ে উঠেছে এবং সেখানে বিদ্যমান ক্ষমতার কাঠামো ও সামাজিক বৈষম্যকে সূক্ষ্মভাবে উন্মোচন করে। ম্যানুয়েলের কাজটি দৃশ্যমান ও শোনার দিক থেকে বিশেষভাবে গঠনমূলক, যা দর্শকের মনোযোগকে ক্লাবের শান্তিপূর্ণ চেহারার পেছনের অন্ধকারে টেনে নিয়ে যায়।
চলচ্চিত্রের চিত্রনাট্য ৪:৩ অনুপাতের ফ্রেমে সাজানো, যা আধুনিক সিনেমার বিস্তৃত স্ক্রিনের তুলনায় সীমিত স্থানকে জোরালোভাবে ব্যবহার করে। শব্দের স্তরকে অতিরিক্তভাবে বাড়িয়ে তোলা হয়েছে, ফলে গলফ কোর্সের পাতা-ফুলের সাঁঝের নীরবতা ও পা-ধাক্কার শব্দগুলো শোনার মতোই স্পর্শযোগ্য হয়ে ওঠে। রঙের প্যালেটটি উজ্জ্বল সবুজ, সোনালি ঘাস এবং পরিষ্কার নীল আকাশের সমন্বয়ে গঠিত, যা একদিকে স্বর্গীয় শান্তি প্রকাশ করে, অন্যদিকে গোপন কষ্টের সূচক হিসেবে কাজ করে।
কাহিনীর কেন্দ্রে রয়েছে ইসাবেল, ১৭ বছর বয়সী এক তরুণী, যিনি দেশের উত্তরাঞ্চল থেকে শহরে এসে ক্লাবের ‘টি গার্ল’ হিসেবে কাজ শুরু করেন। তার কাজটি বাস্তবিকভাবে গলফ রেঞ্জে ধনী পুরুষদের স্বিংয়ের সময় বলগুলো তাদের পায়ের মাঝে রাখার দায়িত্ব। প্রথম দিন থেকেই ইসাবেল ক্লাবের নিখুঁত রক্ষণাবেক্ষণ, সুশোভিত গলফ মাঠ এবং সমৃদ্ধ সদস্যদের চমকপ্রদ জীবনধারার সঙ্গে পরিচিত হন। তার দৃষ্টিতে এই সবই এক ধরনের স্বর্গীয় দৃশ্য, তবে সময়ের সাথে সাথে তিনি দেখেন যে এই স্বর্গের নিচে গোপন কষ্ট লুকিয়ে আছে।
ক্লাবের সদস্যদের মধ্যে রয়েছে এক শিল্পপতি, তার বিদেশে বসবাসকারী ভাতিজি, ক্লাবের সভাপতি এবং তার স্নেহময়ী স্ত্রী, পাশাপাশি চীনা পর্যটকদের একটি দল। এইসব উচ্চবিত্ত ব্যক্তিরা ক্লাবের সেবা কর্মীদের সঙ্গে এক জটিল নৃত্য গড়ে তোলেন, যেখানে সেবা কর্মীরা নিঃশব্দে তাদের চাহিদা পূরণ করে। ইসাবেল এই নৃত্যের মধ্যে নিজেকে ছোট্ট একটি দৃষ্টান্ত হিসেবে অনুভব করেন, যা তাকে ক্লাবের অভ্যন্তরে লুকিয়ে থাকা ক্ষমতার গতি-প্রবাহের প্রতি সচেতন করে।
‘ফিলিপিন্যা’ ছবির নির্মাণশৈলীতে ফ্রেমিং, শব্দের গঠন এবং রঙের ব্যবহার একত্রে এমন একটি স্থবিরতা তৈরি করে, যা ধীরে ধীরে দর্শকের সামনে ক্ষমতার জটিলতা ও সহানুভূতির অভাবকে প্রকাশ করে। গলফ কোর্সের শান্তিপূর্ণ দৃশ্যগুলোকে ব্যাকগ্রাউন্ডে রেখে, চলচ্চিত্রটি সূক্ষ্মভাবে দেখায় যে এই শান্তি কীভাবে শ্রমিকদের শোষণ ও সামাজিক বৈষম্যের উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। চলচ্চিত্রের কিছু দৃশ্যে ব্যাসবের্কি-ধাঁচের নৃত্যশৈলী দেখা যায়, যেখানে কর্মীরা সমন্বিতভাবে চলাফেরা করে, যা ক্লাবের শৃঙ্খলা ও নিয়ন্ত্রণের প্রতীক হিসেবে কাজ করে।
বার্লিন আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে এই চলচ্চিত্রের ইউরোপীয় প্রিমিয়ারটি রাজনৈতিক পরিবেশের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ, যেখানে শিল্পকর্ম প্রায়ই সামাজিক মন্তব্যের মাধ্যমে আলোচনার মঞ্চ তৈরি করে। ‘ফিলিপিন্যা’ তার সূক্ষ্ম কিন্তু দৃঢ় বার্তা দিয়ে দর্শকদের ক্লাবের মসৃণ পৃষ্ঠের নিচে লুকিয়ে থাকা কষ্টের প্রতি মনোযোগ আকর্ষণ করে। উৎসবে উপস্থিত আন্তর্জাতিক সমালোচক ও দর্শকরা ছবির ভিজ্যুয়াল ও শোনার গঠনকে প্রশংসা করেছেন, বিশেষ করে এর অপ্রচলিত ৪:৩ ফরম্যাট ও শব্দের তীব্রতা।
ফিলিপিনার সিনেমা শিল্পের জন্য এই চলচ্চিত্রটি একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে, কারণ এটি স্থানীয় বাস্তবতা ও আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্রমঞ্চের সংযোগকে নতুনভাবে উপস্থাপন করে। ম্যানুয়েলের প্রথম কাজের এই সাফল্য ভবিষ্যতে আরও বেশি ফিলিপিনো চলচ্চিত্রকে বৈশ্বিক মঞ্চে নিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা বাড়িয়ে দেয়।
‘ফিলিপিন্যা’ দর্শকদেরকে ক্লাবের নিখুঁত দৃশ্যের পেছনে লুকিয়ে থাকা সামাজিক কাঠামোর প্রতি প্রশ্ন তুলতে উদ্বুদ্ধ করে, এবং একই সঙ্গে চলচ্চিত্রের শিল্পগত দিক থেকে নতুন দৃষ্টিকোণ প্রদান করে। এই চলচ্চিত্রটি কেবল বিনোদন নয়, বরং সমাজের অদৃশ্য দিকগুলোকে উন্মোচন করার একটি শক্তিশালী মাধ্যম হিসেবে কাজ করে।



