নুরুল হক নুর, যাকে তরুণ রাজনীতিবিদদের মধ্যে ভিপি নুর নামে চেনা যায়, ২০২৪ সালের শেষের দিকে ট্রাক প্রতীকে নিবন্ধিত দল গঠন করে এবং ২০২৬ সালে সংসদে নির্বাচিত হন। তার রাজনৈতিক উত্থান ২০১৮ সালের কোটা সংস্কার আন্দোলন থেকে শুরু হয়, যখন তিনি কোটা সংস্কারের দাবিতে রাস্তায় নেমে ছিলেন এবং সেখান থেকে ধারাবাহিকভাবে বিরোধী শক্তির লক্ষ্যবস্তু হয়ে ওঠেন।
১৯৪ জানুয়ারি ১৯৯৪-এ পটুয়াখালীর গলাচিপা উপজেলার চর বিশ্বাস ইউনিয়নে জন্ম নেওয়া নুরের বাবা ইদ্রিস হাওলাদার এবং মা মরহুম নিলুফা বেগম। তিন ভাই ও পাঁচ বোনের মধ্যে তিনি দ্বিতীয় সন্তান। প্রাথমিক শিক্ষা স্থানীয় বিদ্যালয়ে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত সম্পন্ন করার পর গাজীপুর বিজয় সরণি স্কুলে ভর্তি হন, এরপর উত্তরা স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে এসএসসি সম্পন্ন করেন। উচ্চশিক্ষা হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগে ভর্তি হয়ে তিনি ছাত্র আন্দোলনের সঙ্গে পরিচিত হন।
২০১৮ সালে কোটা সংস্কার আন্দোলনের সময় নুর প্রথমবার জনসমক্ষে উপস্থিত হন। কোটা সংস্কারের দাবি নিয়ে রাস্তায় নেমে তিনি ছাত্রলীগের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েন; ছাত্রলীগ, যা তখন বাংলাদেশ সরকারের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে কাজ করছিল, নুরকে সহজ লক্ষ্যবস্তু হিসেবে চিহ্নিত করে। ফলে নুরের মুখে বহুবার আঘাত, মামলা এবং শারীরিক নির্যাতন ঘটে, যা তার রাজনৈতিক পরিচয়কে দৃঢ় করে।
শেখ হাসিনার শাসনামলে ছাত্রলীগের প্রভাব বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নুরের বিরুদ্ধে আক্রমণ বাড়ে। রাস্তায় তার রক্তাক্ত মুখের ছবি টেলিভিশন, সংবাদপত্র এবং সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপকভাবে প্রচারিত হয়, যা তাকে ‘মার খেতে খেতে নেতা’ হিসেবে পরিচিত করে। নুরের এই দৃঢ়তা এবং প্রতিবাদে অবিচলতা তাকে তরুণ ভোটারদের মধ্যে জনপ্রিয় করে তোলে।
২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে নুরের ভূমিকা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তিনি একবারের মতো একটি বক্তৃতা দেন, যা সামাজিক মাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং সরকারী নীতির দুর্বলতা প্রকাশ করে। তার বক্তব্যের ফলে শীঘ্রই সরকারী নীতি সংশোধনের চাপ বাড়ে, যা শেষ পর্যন্ত শেখ হাসিনার শাসনের কিছু অংশে পরিবর্তন আনে।
২০১৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডিইউসিএসইউ) নির্বাচনে নুর দীর্ঘ ২৮ বছর পর সহসভাপতি পদে নির্বাচিত হন। মূলধারার ছাত্ররাজনীতির বাইরে থেকেও তিনি বিশাল ভোটে জয়লাভ করেন, যা তার জনপ্রিয়তা এবং সংগঠন ক্ষমতা প্রমাণ করে। এই জয় তাকে জাতীয় রাজনীতির মঞ্চে প্রবেশের পথ খুলে দেয়।
২০২১ সালে নুর নাগরিক অধিকার পরিষদ গঠন করেন, যা পরে বাংলাদেশ গণ অধিকার পরিষদে রূপান্তরিত হয়। এই সংগঠনটি মানবাধিকার, শাসনব্যবস্থা এবং ন্যায়বিচার সংক্রান্ত বিষয়গুলোতে সক্রিয়ভাবে কাজ করে, এবং তরুণ সক্রিয়দের মধ্যে সমর্থন অর্জন করে।
সেপ্টেম্বর ২০২৪-এ নির্বাচন কমিশনের কাছ থেকে ট্রাক প্রতীকে রাজনৈতিক দল নিবন্ধন পাওয়ার পর নুরের দল দ্রুতই দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে শাখা গঠন করে এবং স্থানীয় সমস্যাগুলোকে জাতীয় আলোচনায় তুলে ধরতে শুরু করে। দলটির মূল লক্ষ্য হিসেবে ন্যায়সঙ্গত কোটা সংস্কার, শিক্ষার অধিকার এবং মানবাধিকার রক্ষা উল্লেখ করা হয়।
২০২৬ সালের সাধারণ নির্বাচনে নুরের দল থেকে প্রার্থী হিসেবে তিনি সংসদে নির্বাচিত হন, যা তার রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের সর্বোচ্চ শিখর। বিরোধীরা তার দ্রুত উত্থানকে ‘বৈধতা ছাড়া ক্ষমতা’ হিসেবে সমালোচনা করেন, তবে নুরের সমর্থকরা তাকে তরুণ প্রজন্মের প্রতিনিধিত্বকারী নেতা হিসেবে প্রশংসা করেন। তার সংসদে প্রবেশের ফলে যুবকেন্দ্রিক নীতি, কোটা সংস্কার এবং মানবাধিকার সংক্রান্ত আইন প্রণয়নে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি আসার সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে।
নুরের রাজনৈতিক যাত্রা ছাত্র আন্দোলন, মানবাধিকার সংগঠন এবং পার্টি গঠনের মাধ্যমে গড়ে উঠেছে। তার অভিজ্ঞতা এবং সংগ্রাম ভবিষ্যতে তরুণ রাজনীতিবিদদের জন্য একটি মডেল হতে পারে, এবং দেশের রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে নতুন শক্তি ও দৃষ্টিভঙ্গি যোগ করবে।



