নিউইয়র্কের একটি ফেডারেল আদালতে ৫৪ বছর বয়সী ভারতীয় নাগরিক নিখিল গুপ্ত তার ওপর আরোপিত হত্যার ষড়যন্ত্র, ভাড়াটে হত্যাকারী নিয়োগ এবং অর্থ পাচারের অভিযোগ স্বীকার করেন। তিনি গুরপতবন্ত সিং প্যাননুন, যিনি খালিস্তানি আন্দোলনের নেতা ও যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক, তার মৃত্যুর পরিকল্পনা করেছেন বলে স্বীকারোক্তি দেন। এই স্বীকারোক্তি আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক আলোচনার নতুন পর্যায়ে নিয়ে এসেছে।
প্রসিকিউটররা জানিয়েছেন, গুপ্ত ভাড়াটে হত্যাকারী নিয়োগ, হত্যার পরিকল্পনা এবং তহবিলের লেনদেনের সব দিক স্বীকার করেছেন। আদালতে তার স্বীকারোক্তির ভিত্তিতে ২৯ মে তার শাস্তি নির্ধারণের সম্ভাবনা রয়েছে, এবং প্রমাণিত হলে সর্বোচ্চ চল্লিশ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড হতে পারে। চূড়ান্ত রায় এখনও বিচারকের হাতে রয়ে গেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল প্রসিকিউটরদের দাবি, নিখিল গুপ্তকে ভারত সরকারের কোনো কর্মকর্তার নির্দেশে প্যাননুনের হত্যা পরিকল্পনা করতে বলা হয়েছিল। যদিও আদালতের নথিতে সরাসরি নাম উল্লেখ না করা হলেও, লক্ষ্য ব্যক্তি প্যাননুন ছিলেন, যাকে যুক্তরাষ্ট্রে শিকাগো ভিত্তিক শিখ রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।
প্যাননুনকে ভারতের প্রধান সন্ত্রাসবিরোধী আইন, ইউএপিএর অধীনে ‘সন্ত্রাসী’ হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে এবং তার সংগঠনকে ভারতে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। ভারতের দৃষ্টিতে, তিনি ‘খালিস্তান’ রাষ্ট্র গঠনের নামে বিচ্ছিন্নতাবাদী কার্যক্রম চালাচ্ছেন বলে অভিযোগ করা হয়।
প্রসিকিউশন অনুসারে, ২০২৩ সালে নিখিল গুপ্তকে বিকাশ যাদব নামে এক ব্যক্তি নিয়োগ করেন, যিনি ভারতের মন্ত্রিপরিষদ সচিবালয়ের সঙ্গে সংযুক্ত ছিলেন। যাদবের মাধ্যমে ভারতের বৈদেশিক গোয়েন্দা সংস্থা ‘R’ এর কার্যক্রম চালু হয় এবং প্যাননুনের হত্যার জন্য যুক্তরাষ্ট্রে একটি ভাড়াটে হত্যাকারী খোঁজার নির্দেশ দেয়া হয়।
গুপ্তের স্বীকারোক্তিতে উল্লেখ আছে, তিনি যাদের সঙ্গে যোগাযোগ করছিলেন, তারা প্রকৃতপক্ষে মার্কিন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার সূত্র হিসেবে কাজ করছিল। তাই তিনি জানতেন না যে তার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা সংস্থার এজেন্ট। এই তথ্য তদন্তকারীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
হত্যার চুক্তির মোট মূল্য এক লাখ মার্কিন ডলার নির্ধারিত হয়েছিল, যার মধ্যে প্রথমে পনেরো হাজার ডলার অগ্রিম প্রদান করা হয়। এই অর্থের মাধ্যমে হত্যাকারীকে নিয়োগ এবং পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
গুপ্ত প্যাননুনের বাড়ির ঠিকানা, ফোন নম্বর এবং অন্যান্য ব্যক্তিগত তথ্য সরবরাহ করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এই তথ্যের ভিত্তিতে হত্যাকারীকে লক্ষ্য স্থানে পৌঁছানোর পরিকল্পনা করা হয়।
মার্কিন ড্রাগ এনফোর্সমেন্ট অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (DEA) এবং ফেডারেল ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (এফবিআই) যৌথভাবে এই ষড়যন্ত্রের তদন্ত পরিচালনা করে। তদন্তের ফলস্বরূপ, হত্যার পরিকল্পনা নষ্ট করা হয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট সকলকে গ্রেফতার করা হয়েছে।
এই মামলাটি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কূটনৈতিক উত্তেজনা বাড়িয়ে তুলেছে। ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে এই ধরনের অপরাধমূলক সংযোগের অভিযোগ দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। উভয় পক্ষই ঘটনাটির পরিপ্রেক্ষিতে নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করতে চাচ্ছে।
নিখিল গুপ্তের স্বীকারোক্তি এবং মামলার অগ্রগতি যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল আদালতে পরবর্তী শুনানিতে আলোচিত হবে। শাস্তি নির্ধারণের তারিখ ২৯ মে নির্ধারিত, এবং সেই দিন পর্যন্ত মামলার সকল প্রমাণ ও যুক্তি বিচারকের সামনে উপস্থাপন করা হবে।
শুনানির ফলাফল এবং সম্ভাব্য শাস্তি উভয় দেশের আইনি ব্যবস্থা ও কূটনৈতিক নীতিতে প্রভাব ফেলবে। এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে, আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা সংস্থাগুলোও সংশ্লিষ্ট তথ্য বিশ্লেষণ করে ভবিষ্যতে অনুরূপ ষড়যন্ত্র রোধে পদক্ষেপ নেওয়ার পরিকল্পনা করছে।



