মিউনিখ নিরাপত্তা সম্মেলনের উদ্বোধনী সেশনে জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মার্জ ২০২৬ সালে আন্তর্জাতিক শৃঙ্খলা ভেঙে পড়ার ঝুঁকি সম্পর্কে সতর্কবার্তা জানালেন। তিনি যুক্তি দেন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা ন্যাটো‑ভিত্তিক ব্যবস্থা এখন অস্থিতিশীল অবস্থায় পৌঁছেছে, যা বৈশ্বিক নিরাপত্তা কাঠামোকে হুমকির মুখে ফেলছে।
মার্জের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নীতি-নির্ধারণের পরিবর্তন, বিশেষত ন্যাটো‑বিরোধী রূপরেখা, আন্তর্জাতিক জোটের ঐতিহ্যিক ভিত্তিকে দুর্বল করেছে। তিনি উল্লেখ করেন, ট্রাম্পের নেতৃত্বে বিশ্ব এখন ‘ধ্বংসাত্মক’ রাজনীতির যুগে প্রবেশ করেছে, যা গত আট দশক ধরে গড়ে ওঠা শৃঙ্খলাকে অনন্য চাপে ফেলছে।
মিউনিখ নিরাপত্তা প্রতিবেদন ২০২৬-এ এই প্রবণতাকে বিশ্লেষণ করে দেখানো হয়েছে যে, বড় শক্তিগুলোর স্বার্থপর রাজনীতি স্বাধীনতা ও নিরাপত্তার গ্যারান্টি আর দিতে পারছে না। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ইউরোপীয় দেশগুলোকে এই নতুন বাস্তবতার মোকাবিলায় উল্লেখযোগ্য ‘ত্যাগ’ করতে হতে পারে, যদিও তা কী রূপ নেবে তা স্পষ্ট নয়।
চ্যান্সেলর মার্জের উদ্বোধনী ভাষণে তিনি স্পষ্টভাবে বলেছিলেন, আন্তর্জাতিক নিয়মভিত্তিক ব্যবস্থা এখন আর পূর্বের মতো শক্তিশালী নয়। তিনি যুক্তি দেন, ইউরোপের দীর্ঘদিনের মিত্র মার্কিন সরকারের সঙ্গে সম্পর্কের গভীর ফাটল গড়ে উঠেছে, যা ট্রাম্পের সাম্প্রতিক নীতিগুলোর ফলে আরও প্রশস্ত হয়েছে।
মার্জ আরও জানালেন, ইউরোপের নিজস্ব পারমাণবিক প্রতিরক্ষা গড়ে তুলতে ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁরের সঙ্গে গোপন আলোচনা চলছে। তিনি উল্লেখ করেন, যদিও ইউরোপ বর্তমানে মার্কিন সরকারের পারমাণবিক ছাতার ওপর নির্ভরশীল, ট্রাম্পের ন্যাটো‑বিরোধী অবস্থান ইউরোপকে বিকল্প নিরাপত্তা ব্যবস্থা অনুসন্ধানে বাধ্য করছে।
ইমানুয়েল মাখোঁরের সঙ্গে এই গোপন আলোচনার বিষয় হল ইউরোপীয় ইউনিয়নের স্বতন্ত্র পারমাণবিক ক্ষমতা গড়ে তোলা, যা ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্রের ছাতার ওপর নির্ভরতা কমাতে পারে। মার্জের মতে, এই উদ্যোগটি ইউরোপের নিরাপত্তা স্বনির্ভরতা নিশ্চিত করার একটি কৌশলগত পদক্ষেপ।
মার্জের বক্তব্যের পর মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওও মঞ্চে এসে বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক পরিবর্তনকে ‘নতুন যুগ’ হিসেবে বর্ণনা করেন। রুবিও উল্লেখ করেন, বিশ্ব দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে এবং সকল দেশের উচিত তাদের ভূমিকাকে পুনর্বিবেচনা করা, যাতে নতুন বাস্তবতার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া যায়।
রুবিওর মন্তব্যে তিনি ন্যাটো‑বিরোধী নীতিগুলোর প্রভাব স্বীকার করে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা কাঠামো পুনর্গঠন প্রয়োজন, তবে তা আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ভিত্তিতে হওয়া উচিত। তিনি জোর দেন, ইউরোপের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সমন্বিত প্রচেষ্টা অপরিহার্য।
বিশ্লেষকরা ইঙ্গিত করছেন, মার্জের সতর্কবার্তা এবং রুবিওর ‘নতুন যুগ’ মন্তব্য ভবিষ্যতে ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের পুনর্গঠনকে ত্বরান্বিত করতে পারে। বিশেষত পারমাণবিক প্রতিরক্ষা বিষয়ে গোপন আলোচনার প্রকাশ ইউরোপের নিরাপত্তা নীতিতে নতুন দিক নির্দেশ করতে পারে।
মার্জের উদ্বোধনী ভাষণ এবং রুবিওর মন্তব্যের পর আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এই পরিবর্তনগুলোকে ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। উভয় পক্ষেরই স্পষ্ট লক্ষ্য হল বৈশ্বিক নিরাপত্তা কাঠামোকে স্থিতিশীল করা, যদিও পদ্ধতি ও অগ্রাধিকার ভিন্ন হতে পারে।
এই প্রেক্ষাপটে, ইউরোপীয় দেশগুলোকে কী ধরনের ‘ত্যাগ’ করতে হবে এবং কীভাবে পারমাণবিক স্বনির্ভরতা অর্জন করা যাবে, তা এখন আন্তর্জাতিক আলোচনার মূল বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। ভবিষ্যতে ন্যাটো‑বিরোধী নীতিগুলোর প্রভাব এবং ইউরোপের স্বতন্ত্র নিরাপত্তা কৌশল কীভাবে গড়ে উঠবে, তা নির্ধারণ করবে বৈশ্বিক শৃঙ্খলার নতুন দিকনির্দেশনা।



