২০২৪ সালের ১৩তম জাতীয় নির্বাচনে ভোটাররা তাদের ভোটাধিকার পুনরুদ্ধার করে এবং একই সঙ্গে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় চিহ্নিত করে। ভোটের ফলাফল অনুযায়ী বিএনপি ১৭ বছরের বিরতির পর আবার সরকার গঠন করে, আর জামায়াত-এ-ইসলামি তার ইতিহাসে সর্বোচ্চ সংখ্যক আসন জয় করে।
বিএনপি দীর্ঘ সময়ের দমন ও কষ্টের পর পুনরায় শাসন ক্ষমতা পায়, যা দেশের রাজনৈতিক মানচিত্রে বড় পরিবর্তন আনে। এই জয়কে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা ১৭ বছর ধরে চলা দমন নীতি ও জনমতের পরিবর্তনের ফলাফল হিসেবে ব্যাখ্যা করছেন।
জামায়াত-এ-ইসলামি এই নির্বাচনে তার সর্বোচ্চ আসন সংখ্যা অর্জন করে এবং প্রথমবারের মতো প্রধান বিরোধী দল হিসেবে অবস্থান করে। পূর্বে এটি কখনোই পার্লামেন্টে প্রধান বিরোধী ভূমিকা পালন করেনি, তাই এই ফলাফল তার রাজনৈতিক অবস্থানকে নতুন দিগন্তে নিয়ে যায়।
বিএনপি ও জামায়াতের সম্পর্কের শিকড় ২০০১ সালের চারদলীয় জোটে রয়েছে, যখন উভয় দল একসাথে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করে। সেই সময়ে জামায়াতের দুইজন নেতা বিএনপির মন্ত্রিপরিষদে অন্তর্ভুক্ত হন, তবে পরবর্তীতে তারা যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে ফাঁসি পায়।
২০২৪ সালের ব্যাপক বিদ্রোহের পর রাজনৈতিক পরিবেশে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন ঘটে। আওয়ামী লীগের প্রভাব হ্রাস পায়, ফলে বিএনপি ও জামায়াত-এ-ইসলামি নির্বাচনী মঞ্চে প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে ওঠে। এই পরিবর্তন দেশের গণতান্ত্রিক রূপান্তরের নতুন ধাপ নির্দেশ করে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতি বিজ্ঞান অধ্যাপক সাব্বির আহমেদ এবং ঝাঁঝারগড় বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি অধ্যাপক আল মাসুদ হাসানুজ্জামান উভয়ই উল্লেখ করেন যে, বিএনপি ১৭ বছর ধরে দমন ও কষ্টের মুখোমুখি হয়েছে, যা জনগণের মধ্যে পার্টির প্রতি সহানুভূতি বাড়িয়ে দিয়েছে।
বিএনপির দীর্ঘকালীন চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়ার সাম্প্রতিক মৃত্যুও এই সহানুভূতিকে আরও গভীর করে, ফলে নির্বাচনে পার্টির জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি হয়। জনগণ তার মৃত্যুকে শোকের সঙ্গে সঙ্গে রাজনৈতিক পরিবর্তনের সংকেত হিসেবে দেখেছে।
সাব্বিরের মতে, ৫ই আগস্টের পর বিএনপির ওপর বাড়তি চাঁদাবাজির অভিযোগের ফলে নেতিবাচক ধারণা তৈরি হয়েছিল, তবে তার সন্তান তারেকের দেশে ফিরে আসা কিছুটা শীতলতা নিয়ে আসে। তারেকের উপস্থিতি পার্টির কিছু বিতর্কিত উপাদানকে নিয়ন্ত্রণে রাখে এবং মিডিয়ার অতিরিক্ত উত্তেজনা কমিয়ে দেয়।
নির্বাচন কমিশনের অপ্রকাশিত ফলাফল অনুযায়ী, বিএনপি পার্লামেন্টে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে এবং জামায়াত-এ-ইসলামি তার সর্বোচ্চ আসন সংখ্যা পেয়েছে। এই ফলাফলগুলো সরকার গঠন ও বিরোধী দলের ভূমিকা নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলবে।
বিএনপি শাসন ক্ষমতা ফিরে পেয়ে এখন নীতি নির্ধারণে প্রধান ভূমিকা নেবে, আর জামায়াত-এ-ইসলামি প্রধান বিরোধী হিসেবে সরকারের কাজকর্মের ওপর তীক্ষ্ণ নজর রাখবে। উভয় পার্টির পারস্পরিক সম্পর্কের পরিবর্তন সংসদে নতুন গতিবিধি সৃষ্টি করবে।
ভবিষ্যতে বিএনপি সম্ভবত তার জোটদারদের সঙ্গে সমন্বয় করে সরকার গঠন করবে, তবে জামায়াতের প্রধান বিরোধী অবস্থান তাকে নীতি আলোচনায় সক্রিয় ভূমিকা নিতে বাধ্য করবে। উভয় পার্টি দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক নীতিতে প্রভাব বিস্তার করতে পারবে, তবে তাদের পারস্পরিক বিরোধিতার মাত্রা রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাকে প্রভাবিত করতে পারে।
সারসংক্ষেপে, ২০২৪ সালের ১৩তম জাতীয় নির্বাচন বাংলাদেশের রাজনৈতিক দৃশ্যপটে নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে। বিএনপি শাসন পুনরুদ্ধার এবং জামায়াত-এ-ইসলামি প্রধান বিরোধী হিসেবে প্রতিষ্ঠা পায়, যা দেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার পরবর্তী দিক নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।



