বিল ইভান্সের জীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা ‘Everybody Digs Bill Evans’ চলচ্চিত্রটি গ্র্যান্ট গি পরিচালনায়, বার্লিন চলচ্চিত্র উৎসবে প্রতিযোগিতামূলক বিভাগে প্রদর্শিত হয়েছে। অ্যান্ডার্স ড্যানিয়েলসেন লি, লরি মেটক্যালফ, বিল পুলম্যানসহ বিশাল কাস্টের অভিনয় এই ছবিকে সমৃদ্ধ করেছে। ছবির বিষয়বস্তু ১৯৬১ সালের গ্রীষ্মের এক রাত্রে নিউ ইয়র্কের ভিলেজ ভ্যানগার্ডে অনুষ্ঠিত জ্যাজ ট্রায়োর পারফরম্যান্সের চারপাশে ঘোরে।
প্রারম্ভিক দৃশ্যে ভ্যানগার্ডের মঞ্চে বায়ুতে ভাসমান নরম, ধোঁয়াটে জ্যাজের সুর শোনা যায়, যা দর্শকের মনকে আকৃষ্ট করে। পিয়ানো, ডাবল বেস এবং ড্রামসের সূক্ষ্ম সুরের সমন্বয় একটি স্বপ্নময় পরিবেশ তৈরি করে, যেখানে প্রতিটি নোটের মধ্যে কথোপকথনের মতো সাদৃশ্য ফুটে ওঠে। এই মুহূর্তটি চলচ্চিত্রের মূল থিম—সঙ্গীতের মাধ্যমে দুই শিল্পীর গভীর সংলাপ—কে সূক্ষ্মভাবে উপস্থাপন করে।
বিল ইভান্সের ট্রায়ো, যার মধ্যে স্কট লাফারো (উইল স্যাচ) বেসিস্ট এবং ড্রামার অন্তর্ভুক্ত, পাঁচ রাতের ধারাবাহিক পারফরম্যান্সের মাধ্যমে ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ জ্যাজ রেকর্ড তৈরি করেছিল। যদিও ঐ রেকর্ডগুলো সঙ্গীতের দিক থেকে বিশাল গুরুত্ব বহন করে, ছবিটি ঐ ঐতিহাসিক মুহূর্তের চেয়ে শিল্পীদের পারস্পরিক সংযোগকে বেশি গুরুত্ব দেয়। ইভান্সের পিয়ানোতে মনোযোগ এবং লাফারোর বেসে উজ্জ্বল হাসি, মঞ্চে একে অপরের সঙ্গে সুরের সেতু গড়ে তোলার দৃশ্যটি ছবির হৃদয়স্পন্দন।
গ্র্যান্ট গি পরিচালনা শৈলীতে সঙ্গীতের সঙ্গে মানবিক সংবেদনশীলতার মেলবন্ধন স্পষ্ট। তিনি ক্যামেরা দিয়ে সঙ্গীতের তালের সঙ্গে তালে তালে চরিত্রগুলোর মুখের অভিব্যক্তি ধরতে সক্ষম হয়েছেন, যা দর্শকের কাছে একটি অন্তর্দৃষ্টিপূর্ণ অভিজ্ঞতা প্রদান করে। স্ক্রিপ্টার মার্ক ও’হ্যালোরান মূল উপন্যাস ‘ইন্টারমিশন’ থেকে গল্পটি রূপান্তরিত করে, যেখানে জ্যাজের স্বতঃস্ফূর্ততা এবং চরিত্রের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বকে একত্রে উপস্থাপন করা হয়েছে।
অ্যান্ডার্স ড্যানিয়েলসেন লি বিল ইভান্সের ভূমিকায় পিয়ানোতে গভীর মনোযোগের সঙ্গে চরিত্রের অভ্যন্তরীণ দুঃখ-সুখকে প্রকাশ করেছেন। লরি মেটক্যালফ এবং বিল পুলম্যানের পারফরম্যান্স ছবিতে অতিরিক্ত স্তর যোগ করেছে, যেখানে তারা ইভান্সের জীবনের বিভিন্ন দিক—সঙ্গীতের উত্সাহ, ব্যক্তিগত সংগ্রাম এবং শিল্পের প্রতি অটল নিবেদন—কে চিত্রিত করেছে। অন্যান্য অভিনেতা যেমন ব্যারি ওয়ার্ড, ভ্যালিন কেইন, কেটি ম্যাকগ্রাথ এবং ট্যালুলা ক্যাভানাহের উপস্থিতি ছবির বর্ণনাকে সমৃদ্ধ করেছে।
চিত্রের সময়কাল ১ ঘণ্টা ৪২ মিনিট, যা দর্শকদেরকে ইভান্সের সঙ্গীতের জগতে ডুবে যাওয়ার পর্যাপ্ত সময় দেয়। ভ্যানগার্ডের ঐতিহাসিক পরিবেশকে পুনর্নির্মাণের জন্য ব্যবহৃত সেট, আলো এবং সাউন্ড ডিজাইন ছবির বাস্তবিকতা বাড়িয়ে তুলেছে। সঙ্গীতের সুনির্দিষ্ট রেকর্ডিং এবং সাউন্ড মিক্সিং দর্শকের কানকে মুগ্ধ করে, যেন তারা সরাসরি ১৯৬১ সালের ভ্যানগার্ডে বসে আছে।
চলচ্চিত্রের মূল আকর্ষণ হল দুই সঙ্গীতশিল্পীর মধ্যে অব্যক্ত সংলাপ, যেখানে পিয়ানো ও বেসের সুর একে অপরের সঙ্গে সাড়া দেয়। গি এই সংলাপকে কথোপকথনের রূপে উপস্থাপন করেছেন, যেখানে নোটগুলো শব্দের বদলে ভাবের আদান-প্রদান করে। শেষের দিকে এডিটিংয়ের মাধ্যমে এই সুরের সংলাপকে আরও তীব্র করা হয়েছে, যা দর্শকের উপর গভীর প্রভাব ফেলে।
বার্লিন চলচ্চিত্র উৎসবে এই চলচ্চিত্রটি প্রতিযোগিতামূলক বিভাগে নির্বাচিত হওয়ায় আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এর স্বীকৃতি বৃদ্ধি পেয়েছে। জ্যাজ প্রেমিক এবং চলচ্চিত্র সমালোচক উভয়ই ছবির সঙ্গীতিক বিশদ এবং মানবিক দিকের সমন্বয়কে প্রশংসা করেছে। উৎসবে প্রদর্শনের পর, ছবির প্রচারমূলক কার্যক্রম বাড়িয়ে তোলার পরিকল্পনা করা হয়েছে, যাতে আরও বিস্তৃত দর্শকগোষ্ঠীকে আকৃষ্ট করা যায়।
‘Everybody Digs Bill Evans’ শুধুমাত্র একটি সঙ্গীতচিত্র নয়; এটি জ্যাজের ইতিহাস, শিল্পীর আত্মা এবং মানবিক সম্পর্কের এক সূক্ষ্ম অনুসন্ধান। চলচ্চিত্রটি সঙ্গীতের মাধ্যমে মানবিক সংযোগের সম্ভাবনা দেখিয়ে দেয় এবং দর্শকদেরকে ইভান্সের সুরের সঙ্গে নিজস্ব অভিজ্ঞতা গড়ে তুলতে উদ্বুদ্ধ করে। সুতরাং, জ্যাজের অনুরাগী এবং শিল্পের গভীরতা বুঝতে ইচ্ছুক যে কেউ এই ছবিটি মিস করা উচিত নয়।
সামগ্রিকভাবে, গ্র্যান্ট গি এবং তার কাস্টের সমন্বিত প্রচেষ্টা ‘Everybody Digs Bill Evans’কে একটি স্মরণীয় সঙ্গীতচিত্রে রূপান্তরিত করেছে, যা দর্শকের হৃদয়কে স্পর্শ করে এবং জ্যাজের জগতে নতুন দৃষ্টিকোণ প্রদান করে। এই চলচ্চিত্রটি বার্লিনের বড় পর্দায় উজ্জ্বলভাবে প্রদর্শিত হওয়ায়, দেশের চলচ্চিত্রপ্রেমী এবং সঙ্গীতপ্রেমীদের জন্য একটি বিশেষ অভিজ্ঞতা হিসেবে রয়ে যাবে।



