ইউরোপীয় চলচ্চিত্রের দীর্ঘমেয়াদী নায়িকা জুলিয়েট বিনোচ নতুন ল্যান্স হ্যামারের বর্লিন প্রতিযোগিতার নাট্যচিত্র ‘কুইন এট সি’তে প্রধান চরিত্রে আবির্ভূত হয়েছেন। চলচ্চিত্রটি তার মধ্যবয়সের জীবনের জটিলতা, একক মা হিসেবে কিশোরী কন্যার লালন-পালন এবং অ্যালঝেইমার রোগে আক্রান্ত মাতার যত্নের দ্বন্দ্বকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে। পারিবারিক দায়িত্বের সঙ্গে সামাজিক সেবার জটিল প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হয়ে তিনি কীভাবে সমন্বয় করেন, সেটি ছবির মূল থিম।
বিনোচের ক্যারিয়ার চার দশকেরও বেশি সময়ে ইউরোপীয় এবং ফরাসি সিনেমার বিভিন্ন ধারায় ছাপ ফেলেছে। ১৯৯১ সালে লেওস কার্যাক্সের ‘দ্য লাভার্স অন দ্য ব্রিজ’ ছবিতে তিনি বন্য ও উচ্ছ্বাসপূর্ণ গৃহহীন শিল্পীর ভূমিকায় আত্মবিশ্বাসের নতুন মাত্রা যোগ করেন। একই সময়ে, ১৯৯৩ সালে ক্রশ্চিয়ান কিয়েস্লোভস্কির ‘থ্রি কালারস: ব্লু’ তে বিধবা জুলির গভীর শোকের অভ্যন্তরীণ দৃষ্টিভঙ্গি তিনি সূক্ষ্মভাবে উপস্থাপন করেন।
এরপরের বছরগুলোতে তিনি বিভিন্ন আন্তর্জাতিক নির্মাতার সঙ্গে কাজ করে বৈচিত্র্যময় চরিত্রে নিজেকে প্রমাণ করেন। আব্বাস কিয়ারোস্তামির ‘সার্টিফাইড কপি’ তে রহস্যময় ও পরিবর্তনশীল এল্লের ভূমিকায় তিনি মনের জটিলতা প্রকাশ করেন, আর অ্যান হুং ট্রানের ‘দ্য টেস্ট অফ থিংস’ (২০২৩) তে ১৯শ শতাব্দীর রান্নার ঘরে কাজ করা ইউজেনির সংবেদনশীলতা ও সংযমকে তিনি নিখুঁতভাবে চিত্রিত করেন।
হলিউডে তার উপস্থিতি যদিও কম, তবু তা স্বাদে ভিন্ন। ‘চকোলেট’ (২০০০) তে তিনি স্ব-পরিত্যাগকারী শুদ্ধতার প্রতীকী কনফিসার হিসেবে মিষ্টি ও আকর্ষণীয় চরিত্রে দর্শকদের মুগ্ধ করেন। ‘দ্য ইংলিশ পেশেন্ট’ (১৯৯৬) তে তিনি শান্ত ও পবিত্র নার্সের ভূমিকায় অমর হয়ে ওঠেন, যা তাকে একাডেমি পুরস্কার এনে দেয়। এইসব ভূমিকায় তিনি নিজের শৈলীতে নারী চরিত্রের নতুন সংজ্ঞা গড়ে তুলেছেন।
‘কুইন এট সি’তে বিনোচের চরিত্রটি একটি সাধারণ পারিবারিক নারীর মুখোমুখি হওয়া দৈনন্দিন সমস্যাগুলোকে তুলে ধরে। তিনি একদিকে কিশোরী কন্যার যৌন পরিচয় গঠনের পর্যায়ে সমর্থন করেন, অন্যদিকে অ্যালঝেইমার রোগে আক্রান্ত মাতার বাড়িতে অবহেলার সম্ভাবনা নিয়ে উদ্বিগ্ন হন। স্টেপফাদার টম কোর্টের সম্ভাব্য নির্যাতনের ইঙ্গিত ছবিতে সামাজিক নিরাপত্তা নেটের দুর্বলতা প্রকাশ করে।
চিত্রনাট্যটি প্যারিসের সামাজিক হাউস, কেয়ার হোম এবং সামাজিক সেবার অপ্রতুল কাঠামোর মধ্যে চরিত্রের সংগ্রামকে বাস্তবসম্মতভাবে উপস্থাপন করে। গৃহহীনতা, স্বাস্থ্যসেবা, এবং পারিবারিক দায়িত্বের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার চ্যালেঞ্জগুলোকে দৃশ্যমান করে, যা দর্শকদের মধ্যে সহানুভূতি ও সচেতনতা জাগায়।
ফিল্মের নির্মাতা ল্যান্স হ্যামার, যিনি পূর্বে সামাজিক বাস্তবতা ভিত্তিক নাট্যচিত্রে পরিচিত, এই প্রকল্পে ইউরোপীয় চলচ্চিত্রের ঐতিহ্যকে আধুনিক পারিবারিক সমস্যার সঙ্গে মিশ্রিত করেছেন। তার দৃষ্টিভঙ্গি বিনোচের অভিজ্ঞতা ও অভিনয়শৈলীর সঙ্গে সমন্বয় করে একটি সূক্ষ্ম ও গভীর গল্প তৈরি করেছে।
বিনোচের ক্যারিয়ার জুড়ে তিনি বিভিন্ন শৈলীর চরিত্রে নিজেকে মানিয়ে নিয়েছেন, তবে ‘কুইন এট সি’তে তার অভিনয়টি বিশেষভাবে মানবিক দিককে তুলে ধরে। মধ্যবয়সের নারীর আত্মপরিচয়, একক পিতামাতার চ্যালেঞ্জ এবং বৃদ্ধের যত্নের দায়িত্বের মধ্যে তিনি যে মানসিক ভারসাম্য বজায় রাখেন, তা চলচ্চিত্রের মূল শক্তি।
চিত্রের দৃশ্যাবলি প্যারিসের বাস্তবিক পরিবেশে শুট করা হয়েছে, যেখানে কনসিল হাউসের গরম রঙের দেয়াল, কেয়ার হোমের সাদা গাছের ছায়া এবং সামাজিক সেবার অফিসের গম্ভীর অভ্যন্তরীণ দৃশ্যগুলো দর্শকের কাছে পরিচিতি তৈরি করে। এই বাস্তবতা ছবির আবেগময় প্রভাবকে বাড়িয়ে দেয়।
‘কুইন এট সি’ শুধুমাত্র বিনোচের ব্যক্তিগত ক্যারিয়ারের নতুন মাইলফলক নয়, বরং ইউরোপীয় চলচ্চিত্রে সামাজিক বাস্তবতা ও পারিবারিক দায়িত্বের সংমিশ্রণকে নতুন দৃষ্টিকোণ থেকে উপস্থাপন করে। চলচ্চিত্রটি সামাজিক নীতি, স্বাস্থ্যসেবা এবং পারিবারিক কাঠামোর মধ্যে বিদ্যমান ফাঁকগুলোকে আলোকপাত করে, যা দর্শকদের মধ্যে আলোচনার সূত্রপাত করতে পারে।
বিনোচের দীর্ঘদিনের কাজের ধারাবাহিকতা এবং তার নতুন চরিত্রের গভীরতা এই চলচ্চিত্রকে সমসাময়িক ইউরোপীয় সিনেমার একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ করে তুলেছে। ‘কুইন এট সি’ তে তিনি যে মানবিক দিকটি তুলে ধরেছেন, তা দর্শকদের হৃদয়ে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলবে এবং সামাজিক সচেতনতা বাড়াবে।
চলচ্চিত্রটি ইউরোপীয় চলচ্চিত্র উৎসবে অংশগ্রহণের জন্য প্রস্তুত, যেখানে এটি সামাজিক বাস্তবতা ও পারিবারিক থিমের মিশ্রণকে নতুন দৃষ্টিতে উপস্থাপন করবে। বিনোচের পারফরম্যান্স এবং হ্যামারের দৃষ্টিভঙ্গি একসাথে দর্শকদেরকে মধ্যবয়সের নারীর জটিলতা ও পারিবারিক দায়িত্বের গভীরতা অনুভব করাবে।



