গত বছর অক্টোবর মাসে দ্রুত সহায়তা বাহিনী এল‑ফাশার শহর দখল করার পর মাত্র তিন দিনে ছয় হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছে, এ তথ্য জাতিসংঘের মানবাধিকার অফিসের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে প্রকাশিত হয়েছে। শহরের একটি বিশ্ববিদ্যালয় ভবনে আশ্রয় নেওয়া এক হাজার নাগরিকের ওপর গুলি চালিয়ে গুলি চালকরা দেহকে আকাশে ছুঁড়ে ফেলেছিলেন, যা বেঁচে থাকা এক সাক্ষীর মতে হরর সিনেমার দৃশ্যের মতো ছিল।
জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, প্রথম তিন দিনে শহরের মধ্যে প্রায় ৪,৪০০ জন এবং পালানোর পথে ১,৬০০ জনের বেশি প্রাণহানি ঘটেছে। এই সংখ্যা কেবলমাত্র প্রাথমিক রেকর্ড, তবে বিশ্লেষকরা অনুমান করছেন যে পুরো সপ্তাহব্যাপী মৃত্যুর সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে।
প্রতিবেদনটি ব্যাপক মানবাধিকার লঙ্ঘনের প্রমাণ তুলে ধরেছে, যার মধ্যে রয়েছে গৃহহত্যা, সংক্ষিপ্ত শাস্তি, নির্যাতন, অপহরণ এবং যৌন নির্যাতন। এসব কাজকে যুদ্ধাপরাধ এবং মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
দ্রুত সহায়তা বাহিনী এই রিপোর্টের কোনো মন্তব্য করেনি, তবে পূর্বে সমান ধরনের অভিযোগের প্রত্যাখ্যান করেছে। পূর্ববর্তী আক্রমণে নথিভুক্ত অনুরূপ অপরাধের সঙ্গে এই নতুন ফলাফল মিল রয়েছে।
সুদানি সশস্ত্র বাহিনী ও দ্রুত সহায়তা বাহিনী দুজনই এই সংঘাতে ব্যাপক অপরাধের অভিযোগের মুখে। দুই পক্ষই নাগরিকদের ওপর সহিংসতা চালিয়ে চলেছে, যা আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
সংঘাতের মূল কারণ হল প্রায় তিন বছর ধরে চলমান ক্ষমতার সংগ্রাম, যেখানে সুদানি সশস্ত্র বাহিনী ও দ্রুত সহায়তা বাহিনী একে অপরের বিরোধী অবস্থানে রয়েছে। এই দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ ইতিমধ্যে শত শত হাজার মানুষকে প্রাণ হারাতে বাধ্য করেছে।
জাতিসংঘের তথ্য অনুসারে, এখন পর্যন্ত প্রায় তের মিলিয়ন মানুষ তাদের বাড়ি ছেড়ে অন্যত্র আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছে। এই অভ্যন্তরীণ শরণার্থীর সংখ্যা পূর্বের যেকোনো আফ্রিকান সংঘাতের তুলনায় উল্লেখযোগ্য।
যৌন নির্যাতনকে যুদ্ধের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে, যেখানে পুরুষ, নারী ও শিশুরা সমানভাবে শিকার হচ্ছে। এই ধরনের অপরাধের ফলে মানবিক সংকট আরও তীব্রতর হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচের মতে, দ্রুত সহায়তা বাহিনী ও তার মিত্ররা পশ্চিম দারফুরে মাসালিট জনগণ ও অন্যান্য অ-আরব সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে গণহত্যা চালাচ্ছেন। তবে জাতিসংঘের সর্বশেষ রিপোর্টে এই দাবিকে জেনোসাইড হিসেবে চিহ্নিত করা হয়নি।
আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা উল্লেখ করছেন যে, এই ধরনের অপরাধের পরিণতি কেবল সুদানের সীমার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; প্রতিবেশী দেশগুলোও শরণার্থী প্রবাহ ও নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়ছে।
জাতিসংঘের মানবাধিকার অফিসের এক কর্মকর্তা বলছেন, “এল‑ফাশার শহরের উপর ধারাবাহিক অবরোধ ও আক্রমণ মানবিক আইনের গুরুতর লঙ্ঘন।” এই মন্তব্যের পর আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মধ্যে জরুরি পদক্ষেপের আহ্বান বাড়ছে।
এল‑ফাশার, দারফুরের একটি গুরুত্বপূর্ণ নগর, প্রায় এক বছর ও অর্ধেক সময় ধরে অবরোধে ছিল। এই সময়ে শহরের অবকাঠামো ধ্বংস, স্বাস্থ্যসেবা বন্ধ এবং খাদ্য সংকট তীব্রতর হয়েছে।
জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের শেষের দিকে উত্তর রাজ্য ও পূর্ব চাদে মোট ১৪০ জন শিকারী ও সাক্ষীর সাক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। এই সাক্ষ্যগুলোতে গুলিবিদ্ধ, দেহ ছুঁড়ে ফেলা এবং যৌন নির্যাতনের বিশদ বর্ণনা রয়েছে।
প্রথম কয়েক দিনের আক্রমণে, জাতিসংঘের রেকর্ডে দেখা যায় যে শহরের মধ্যে অন্তত ৪,৪০০ জন নিহত হয়েছে এবং পালানোর পথে অতিরিক্ত ১,৬০০ জনের মৃত্যু ঘটেছে।
প্রতিবেদনটি উল্লেখ করে যে, পুরো এক সপ্তাহের আক্রমণে মৃত্যুর প্রকৃত সংখ্যা সম্ভবত আরও বেশি, তবে সঠিক হিসাব এখনও পাওয়া যায়নি।
আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মধ্যে এই ঘটনার প্রতি তীব্র উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের একটি প্রতিনিধি বলেছেন, “মানবিক সহায়তা পৌঁছানো এবং অপরাধের দায়িত্বশীলদের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা জরুরি।”
যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক মন্ত্রণালয়ও দ্রুত সহায়তা বাহিনীর বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা বাড়ানোর সম্ভাবনা বিবেচনা করছে। একই সঙ্গে, শান্তিপূর্ণ সমাধানের জন্য দু’পক্ষের মধ্যে সরাসরি আলোচনার আহ্বান জানানো হয়েছে।
আঞ্চলিকভাবে, চাদ ও লিবিয়ার মতো প্রতিবেশী দেশগুলো শরণার্থী প্রবাহের ফলে মানবিক সংকটের মুখে। এই পরিস্থিতি আফ্রিকান ইউনিয়নের নিরাপত্তা মিশনের কাজকে জটিল করে তুলছে।
বিশ্লেষকরা ভবিষ্যতে আরও বড় মানবিক বিপর্যয়ের ঝুঁকি উল্লেখ করে, যদি দ্রুত সহায়তা বাহিনী ও সুদানি সশস্ত্র বাহিনী কোনো রাজনৈতিক সমঝোতা না করে। আন্তর্জাতিক আদালতে মামলার সম্ভাবনা ও জাতিসংঘের শান্তি রক্ষাকারী মিশনের ভূমিকা এখনো অনিশ্চিত।
সামগ্রিকভাবে, এল‑ফাশার শহরের উপর দ্রুত সহায়তা বাহিনীর আক্রমণ কেবলমাত্র এক শহরের ধ্বংস নয়, বরং পুরো অঞ্চলের নিরাপত্তা ও মানবিক অবস্থার উপর গভীর প্রভাব ফেলছে। জাতিসংঘের রিপোর্ট এই বাস্তবতা তুলে ধরেছে এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে আহ্বান জানাচ্ছে।



