মিউনিখ সিকিউরিটি সম্মেলনের উদ্বোধনী সেশনে জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্জ বিশ্বব্যাপী শাসনব্যবস্থার অবনতি সম্পর্কে সতর্কবার্তা জানিয়ে আন্তর্জাতিক নেতাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। তিনি উল্লেখ করেন, বড় শক্তির স্বার্থপর রাজনীতি এবং ইউরোপ ও মার্কিন সরকারের মধ্যে বাড়তে থাকা উত্তেজনা বর্তমানের স্বাধীনতা ও নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেলেছে। মের্জের বক্তব্যের মূল বিষয় ছিল, ঐতিহ্যগত নিয়মভিত্তিক বিশ্বব্যবস্থা আর পূর্বের মতো কার্যকর নয়।
মের্জ সম্মেলনের উদ্বোধনী ভাষণে জোর দিয়ে বলেন, “আমাদের স্বাধীনতা আর গ্যারান্টি নয়” এবং ইউরোপীয় দেশগুলোকে কঠিন সময়ে ত্যাগ স্বীকার করতে প্রস্তুত হতে হবে। তিনি উল্লেখ করেন, বর্তমান আন্তর্জাতিক পরিবেশে শক্তিশালী দেশগুলো নিজেদের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে, ফলে ঐতিহাসিকভাবে গড়ে ওঠা শাসনমডেল ক্ষয়প্রাপ্ত হচ্ছে। এই পরিস্থিতি ইউরোপীয় নিরাপত্তা কাঠামোর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।
বক্তৃতার মাঝখানে মের্জ স্বীকার করেন, ইউরোপ ও মার্কিন সরকারের মধ্যে “গভীর ফাটল” সৃষ্টি হয়েছে। তিনি বিশেষভাবে ডোনাল্ড ট্রাম্পের ডেনমার্কের সার্বভৌমত্বের ওপর হুমকি, গ্রিনল্যান্ডকে যুক্ত করার ইচ্ছা এবং ইউরোপীয় দেশগুলোর ওপর আরোপিত শুল্ক নীতিগুলোকে উল্লেখ করেন। এই পদক্ষেপগুলোকে ইউরোপের সঙ্গে মার্কিন সম্পর্কের বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষয়কারী হিসেবে বর্ণনা করা হয়। মের্জের মতে, এই ধরনের একতরফা নীতি ইউরোপীয় দেশগুলোর স্বায়ত্তশাসন ও অর্থনৈতিক স্বার্থকে সরাসরি প্রভাবিত করছে।
মার্কো রুবিও, মার্কিন সরকারের সেক্রেটারি অফ স্টেট, মের্জের বক্তব্য শোনার পর সম্মেলনে নিজস্ব ভাষণ দেবেন বলে জানিয়েছেন। রুবিও পূর্বে “ভূ-রাজনৈতিক নতুন যুগ” সম্পর্কে মন্তব্য করে আন্তর্জাতিক মঞ্চে মার্কিন সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশ করেছেন। তার উপস্থিতি এবং আসন্ন ভাষণ মের্জের সতর্কবার্তার সঙ্গে সমন্বয়পূর্ণভাবে আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা ও সহযোগিতার ভবিষ্যৎ দিক নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
এই বছরের সম্মেলনে প্রায় পঞ্চাশজন বিশ্বনেতা অংশগ্রহণের প্রত্যাশা করা হচ্ছে। আলোচনার মূল বিষয়গুলোর মধ্যে ইউরোপীয় প্রতিরক্ষা, ট্রান্সঅ্যাটলান্টিক সম্পর্কের ভবিষ্যৎ এবং ন্যাটো সংস্থার ভূমিকা অন্তর্ভুক্ত। অংশগ্রহণকারীরা বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা, বিশেষ করে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাব এবং চীনের সঙ্গে পশ্চিমা দেশগুলোর সম্পর্কের জটিলতা নিয়ে বিশ্লেষণ করবেন। এছাড়া ইরান ও মার্কিন সরকারের পারমাণবিক চুক্তির সম্ভাব্য পথও আলোচনার সূচিতে রয়েছে।
মার্কিন সরকারের ন্যাটো সংস্থার প্রতি প্রতিশ্রুতি সাম্প্রতিক সময়ে প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের গ্রিনল্যান্ড অধিগ্রহণের ইচ্ছা এবং ইউরোপীয় দেশগুলোর ওপর শুল্ক নীতি এই সন্দেহকে বাড়িয়ে তুলেছে। ইউরোপীয় নেতারা এই পদক্ষেপগুলোকে ন্যাটো সংস্থার ঐক্য ও কার্যকারিতার জন্য বড় ঝুঁকি হিসেবে দেখছেন। ফলে ট্রান্সঅ্যাটলান্টিক নিরাপত্তা কাঠামোর পুনর্গঠন ও নতুন সহযোগিতার মডেল গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা তীব্রতর হয়েছে।
সামগ্রিকভাবে, সম্মেলনে রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘাত, পশ্চিমা দেশ ও চীনের মধ্যে বর্ধিত উত্তেজনা এবং ইরান-মার্কিন পারমাণবিক চুক্তির সম্ভাব্য পুনরায় আলোচনা ইত্যাদি বিষয়গুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। এই বিষয়গুলোই বর্তমান আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা পরিবেশের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে এবং ভবিষ্যৎ নীতি নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলবে।
মের্জের মতে, নিয়মভিত্তিক বিশ্বব্যবস্থা “অপূর্ণ হলেও, তার সর্বোত্তম রূপে এখন আর অস্তিত্বহীন”। তিনি এই অবস্থাকে আরও সরাসরি প্রকাশ করে বলেন, “এই শাসনব্যবস্থা আর তার পূর্বের রূপে নেই”। এই মন্তব্য আন্তর্জাতিক শাসনমডেলের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে গভীর উদ্বেগের সূচনা করে, বিশেষ করে যখন বড় শক্তিগুলো স্বার্থপর নীতি অনুসরণ করছে।
মের্জ আরও উল্লেখ করেন, “ইউরোপ ও মার্কিন সরকারের মধ্যে একটি গভীর ফাটল তৈরি হয়েছে” এবং এক বছর আগে মিউনিখে উপ-প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের একই মন্তব্যের সঠিকতা পুনর্ব্যক্ত করেন। তিনি যুক্তি দেন, “ম্যাগা আন্দোলনের সংস্কৃতি যুদ্ধ আমাদের নয়” এবং মানবিক মর্যাদা ও সংবিধানের সঙ্গে বিরোধপূর্ণ বক্তব্যের ক্ষেত্রে বাকস্বাধীনতা সীমাবদ্ধ করা উচিত। মের্জের দৃষ্টিতে, শুল্ক ও সুরক্ষাবাদ নয়, মুক্ত বাণিজ্যই ইউরোপের অর্থনৈতিক স্বাস্থ্যের মূল ভিত্তি।
এই সতর্কবার্তা এবং আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে ইউরোপীয় দেশগুলোকে এখন কৌশলগত পুনর্মূল্যায়ন করতে হবে। ট্রান্সঅ্যাটলান্টিক সম্পর্কের পুনর্গঠন, ন্যাটো সংস্থার ভূমিকা পুনঃসংজ্ঞায়িত করা এবং বৃহত্তর আন্তর্জাতিক শাসনব্যবস্থার পুনর্নির্মাণের জন্য যৌথ পদক্ষেপ গ্রহণের প্রয়োজনীয়তা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। মের্জের বক্তব্যের প্রভাব ভবিষ্যতে ইউরোপের নিরাপত্তা নীতি, অর্থনৈতিক কৌশল এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার দিকনির্দেশনা গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।



