গত বুধবার সকাল, আরিক এয়ার পরিচালিত একটি বোয়িং ৭৩৭‑৭০০, লাগোস থেকে পোর্ট হারকোর্টের পথে উড়ে যাওয়ার সময় মাঝআকাশে ইঞ্জিনের বিস্ফোরণ ঘটায়। বিমানটি বাম দিকের ইঞ্জিনে অপ্রত্যাশিতভাবে শক ও ধ্বংসের সম্মুখীন হয়, ফলে প্রায় ২৭,০০০ ফুট উচ্চতায় উড্ডয়নের মাঝখানে ইঞ্জিনের বাইরের অংশ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।
বিমানটি ৮০ জন যাত্রী ও ক্রু সদস্যকে বহন করছিল। ইঞ্জিনের ফ্যান ব্লেডে ত্রুটির কারণে কাঠামোগত ব্যর্থতা ঘটেছে বলে প্রাথমিক বিশ্লেষণ করা হয়েছে। ইঞ্জিনের ধ্বংসাবশেষের আঘাতে বিমানের পেছনের ভার্টিক্যাল স্ট্যাবিলাইজারও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
পাইলট দ্রুত জরুরি অবস্থা ঘোষণা করে, বিমানকে নিকটবর্তী বেনিন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ডাইভার্ট করার সিদ্ধান্ত নেন। কঠোর নিয়ন্ত্রণ ও সমন্বয়ের মাধ্যমে বিমানটি সকাল ৮:০৫ মিনিটে নিরাপদে অবতরণ করে, কোনো প্রাণহানি না ঘটিয়ে। সকল যাত্রী ও ক্রু সদস্যকে দ্রুত নিরাপত্তা প্রোটোকল অনুসারে বের করা হয় এবং কোনো গুরুতর আঘাতের রিপোর্ট পাওয়া যায়নি।
নাইজেরিয়ার সিভিল এভিয়েশন অথরিটি (NCAA) ঘটনাটির পর তৎক্ষণাৎ একটি বিবৃতি প্রকাশ করে, বিমান নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য তৎকালীন তদন্ত শুরু হয়েছে বলে জানায়। তারা উল্লেখ করে, ইঞ্জিনের ফ্যান ব্লেডের সম্ভাব্য ত্রুটি ও রক্ষণাবেক্ষণ প্রক্রিয়ার পুনঃমূল্যায়ন করা হবে।
আঞ্চলিক স্তরে, নাইজেরিয়া ও নিকটবর্তী দেশগুলোর বিমান পরিবহন মন্ত্রণালয়গুলো এই ঘটনার প্রতি উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। পশ্চিম আফ্রিকান সিভিল এভিয়েশন অর্গানাইজেশন (WACEO) এই ধরনের ঘটনা পুনরাবৃত্তি রোধে নিরাপত্তা মানদণ্ডের কঠোর প্রয়োগের আহ্বান জানায়। আন্তর্জাতিক নাগরিক বিমান চলাচল সংস্থা (ICAO)ও নাইজেরিয়ার সাথে সমন্বয় করে, ঘটনার মূল কারণ নির্ণয়ের জন্য বিশেষজ্ঞ দল পাঠানোর পরিকল্পনা করেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আফ্রিকায় ইঞ্জিন ফ্যান ব্লেডের ত্রুটির কারণে কয়েকটি অনুরূপ ঘটনা ঘটেছে, যা রক্ষণাবেক্ষণ ও পার্টসের গুণগত মানের ওপর প্রশ্ন তুলেছে। একটি বিমান নিরাপত্তা বিশ্লেষক উল্লেখ করেন, “বহুবার দেখা গেছে, পুরনো বা অপর্যাপ্তভাবে পরীক্ষা করা ফ্যান ব্লেড হঠাৎ ব্যর্থতার মূল কারণ হয়ে দাঁড়ায়, যা উড্ডয়নের সময় গুরুতর ঝুঁকি তৈরি করে।” এই মন্তব্যটি ঘটনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ, কারণ প্রাথমিক তদন্তে ফ্যান ব্লেডের ছিঁড়ে যাওয়াকে প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
অধিকন্তু, এই ঘটনা নাইজেরিয়ার বিমান শিল্পের আন্তর্জাতিক সুনামকে প্রভাবিত করতে পারে। আরিক এয়ার, যা সাম্প্রতিক সময়ে আঞ্চলিক রুট সম্প্রসারণের পরিকল্পনা করছিল, এখন তার ফ্লিটের নিরাপত্তা প্রোটোকল পুনর্বিবেচনা করতে বাধ্য। বিমান সংস্থার মুখপাত্র জানিয়েছেন, সকল ফ্লাইটের জন্য অতিরিক্ত রক্ষণাবেক্ষণ চেক চালু করা হবে এবং প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট মডেলের ফ্লাইট সাময়িকভাবে স্থগিত করা হতে পারে।
আন্তর্জাতিক পর্যায়ে, এই ধরনের দুর্ঘটনা আফ্রিকান বিমান নিরাপত্তা উন্নয়ন পরিকল্পনার অধীনে চলমান উদ্যোগগুলোর পুনঃমূল্যায়নের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে। আফ্রিকান সিভিল এভিয়েশন সিকিউরিটি প্রোগ্রাম (AFSEC) আগামী মাসে নাইজেরিয়া ও অন্যান্য পশ্চিম আফ্রিকান দেশকে অন্তর্ভুক্ত করে একটি শীর্ষ সম্মেলন আয়োজনের পরিকল্পনা করেছে, যেখানে রক্ষণাবেক্ষণ মানদণ্ড, পার্টস সরবরাহ চেইন এবং জরুরি প্রতিক্রিয়া ব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা হবে।
পরবর্তী কয়েক সপ্তাহে, নাইজেরিয়ার বিমান নিরাপত্তা কর্তৃপক্ষ ও আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞ দল একসাথে বিশদ তদন্ত চালাবে। তদন্তের ফলাফল অনুসারে, ইঞ্জিনের ফ্যান ব্লেডের উৎপাদন ব্যাচ, রক্ষণাবেক্ষণ রেকর্ড এবং পূর্ববর্তী ফ্লাইটের ডেটা বিশ্লেষণ করা হবে। ফলাফল প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে, সংশ্লিষ্ট এয়ারলাইন ও রক্ষণাবেক্ষণ সংস্থাগুলোর ওপর প্রয়োজনীয় শাস্তিমূলক বা সংশোধনমূলক পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
এই ঘটনাটি আফ্রিকান আকাশে নিরাপত্তা সংস্কারের জরুরি প্রয়োজনীয়তা পুনরায় তুলে ধরেছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সমর্থন ও প্রযুক্তিগত সহায়তা, পাশাপাশি আঞ্চলিক সহযোগিতা, নাইজেরিয়া ও তার প্রতিবেশী দেশগুলোর জন্য নিরাপদ ও নির্ভরযোগ্য বিমান পরিবহন নিশ্চিত করার মূল চাবিকাঠি হবে।



