রাশিয়ার প্যাসিফিক নৌবহর এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে দীর্ঘমেয়াদী সমুদ্র মিশন শুরু করেছে। বিশেষ নৌবহরে দুইটি আধুনিক কর্ভেট ‘সোভারশেনি’ ও ‘রেজকি’ এবং মাঝারি আকারের সি‑ট্যাঙ্কার ‘পেচেঙ্গা’ অন্তর্ভুক্ত। মিশনের লক্ষ্য অঞ্চলীয় সমুদ্র নিরাপত্তা জোরদার করা এবং কৌশলগত উপস্থিতি প্রদর্শন।
বহরের গঠন রাশিয়ার সামুদ্রিক শক্তির সাম্প্রতিক আধুনিকীকরণকে প্রতিফলিত করে। কর্ভেটগুলো সর্বাধুনিক রাডার ও মিসাইল সিস্টেমে সজ্জিত, আর পেচেঙ্গা জাহাজ জ্বালানি সরবরাহ ও লজিস্টিক সাপোর্ট প্রদান করতে সক্ষম। এই সংমিশ্রণ দীর্ঘ সময়ের জন্য সমুদ্রে উপস্থিতি বজায় রাখতে প্রয়োজনীয় বহুমুখী ক্ষমতা নিশ্চিত করে।
প্রেস সার্ভিসের তথ্য অনুযায়ী, মিশনের অংশ হিসেবে রাশিয়ার জাহাজগুলো এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরের বন্ধুপ্রতীম দেশগুলোর প্রধান বন্দরগুলোতে সৌজন্য সফর করবে। সফরের সময় স্থানীয় নৌবাহিনীর সঙ্গে যৌথ মহড়া ও প্রশিক্ষণেও অংশ নেওয়া হবে। এই ধরনের সফর কূটনৈতিক বন্ধনকে শক্তিশালী করে এবং সমুদ্র নিরাপত্তা সংক্রান্ত সমন্বয়কে সহজতর করে।
জাপান সাগরে নিজস্ব নৌঘাঁটি ত্যাগের পর রাশিয়ান নাবিকরা আকাশপথে হামলা মোকাবিলার প্রাথমিক মহড়া সম্পন্ন করেছে। বিমান থেকে আক্রমণ সিমুলেট করে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা পরীক্ষা করা হয় এবং সাফল্যের সঙ্গে সমাপ্তি ঘটেছে। এই প্রশিক্ষণ ভবিষ্যতে সম্ভাব্য হাইব্রিড হুমকির মোকাবিলার প্রস্তুতি বাড়ায়।
একই সময়ে, সমুদ্রপৃষ্ঠের অমানবিক নৌযান (অনক্রুড সারফেস ভেসেল) আক্রমণ প্রতিহত করার জন্য বিশেষ ড্রোন প্রতিরোধ মহড়া চালানো হয়েছে। রাশিয়ান জাহাজগুলো স্বয়ংক্রিয় সিস্টেম ব্যবহার করে ড্রোন সনাক্তকরণ ও ধ্বংসের প্রক্রিয়া অনুশীলন করেছে। এই ধরনের প্রশিক্ষণ আধুনিক নৌযানের বহুমুখী হুমকি মোকাবিলার সক্ষমতা বাড়ায়।
পিটার দ্য গ্রেট বে অঞ্চলে কেএ‑২৭ হেলিকপ্টার ব্যবহার করে ডুবোজাহাজ বিরোধী যুদ্ধের কৌশলও অনুশীলন করা হয়েছে। হেলিকপ্টার থেকে ডিপথ সনাক্তকরণ, ট্র্যাকিং ও টর্চার ব্যবহার করে সাবমেরিনের বিরুদ্ধে আক্রমণ সিমুলেট করা হয়। এই প্রশিক্ষণ রাশিয়ার নৌবহরের অ্যান্টি‑সাবমেরিন ক্ষমতা যাচাইয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ।
বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেন, রাশিয়া এই মিশনকে আঞ্চলিক সামুদ্রিক নিরাপত্তা জোরদার এবং আন্তর্জাতিক সমুদ্র পথে তার প্রভাব বিস্তারের একটি কৌশলগত পদক্ষেপ হিসেবে দেখছে। দীর্ঘমেয়াদী উপস্থিতি রাশিয়ার বাণিজ্যিক রুটের সুরক্ষা এবং জ্বালানি সরবরাহের ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করতে সহায়তা করবে। একই সঙ্গে, এটি যুক্তরাষ্ট্র ও জাপানের সঙ্গে চলমান নৌবাহিনীর প্রতিযোগিতার প্রেক্ষাপটে একটি সতর্কতা সংকেত হিসাবেও কাজ করতে পারে।
এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরের অন্যান্য প্রধান নৌশক্তি, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র, জাপান ও অস্ট্রেলিয়া, রাশিয়ার এই উদ্যোগকে ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। যদিও এখন পর্যন্ত কোনো সরকারি প্রতিবাদ প্রকাশিত হয়নি, তবে নিরাপত্তা সংলাপের গুরুত্ব বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এই পরিস্থিতি ভবিষ্যতে বহুপাক্ষিক মহড়া ও নিরাপত্তা চুক্তির আলোচনার দিকে নিয়ে যেতে পারে।
রাশিয়ার নৌবহর আগামী কয়েক মাসে দক্ষিণ চীন সাগর, ভিয়েতনাম ও ফিলিপাইনের বন্দরগুলোতে সফর করার পরিকল্পনা করেছে। প্রত্যেক সফরে স্থানীয় নৌবাহিনীর সঙ্গে যৌথ প্রশিক্ষণ এবং মানবিক সহায়তা কার্যক্রমের সম্ভাবনা রয়েছে। মিশনের শেষ পর্যায়ে রাশিয়া আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামোর মধ্যে তার ভূমিকা পুনর্ব্যক্ত করার জন্য একটি বড় সমাবেশের আয়োজনের কথা বিবেচনা করছে।
এই মিশন রাশিয়ার সামুদ্রিক কৌশলের একটি নতুন পর্যায়ের সূচনা নির্দেশ করে। দীর্ঘমেয়াদী উপস্থিতি জাহাজের রক্ষণাবেক্ষণ, জ্বালানি সরবরাহ ও ক্রু রোটেশনকে সহজতর করবে, ফলে সমুদ্রের গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক রুটে হস্তক্ষেপের ঝুঁকি কমবে। একই সঙ্গে, এটি আঞ্চলিক দেশগুলোর সঙ্গে নিরাপত্তা সহযোগিতা বাড়িয়ে সামগ্রিক স্থিতিশীলতা বৃদ্ধি করবে।
একজন সামুদ্রিক নিরাপত্তা বিশ্লেষক মন্তব্য করেন, “রাশিয়ার এই দীর্ঘমেয়াদী নৌবহরের উপস্থিতি এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরের শক্তি ভারসাম্যকে পুনর্গঠন করতে পারে এবং ভবিষ্যৎ নৌ কৌশলগত পরিকল্পনার ভিত্তি স্থাপন করবে।” এই দৃষ্টিভঙ্গি মিশনের কৌশলগত গুরুত্বকে পুনরায় জোর দেয়।
সারসংক্ষেপে, রাশিয়ার প্যাসিফিক নৌবহরের এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরে দীর্ঘমেয়াদী মিশন সমুদ্র নিরাপত্তা, কূটনৈতিক সংযোগ ও কৌশলগত উপস্থিতি তিনটি স্তরে প্রভাব ফেলবে। ভবিষ্যতে নির্ধারিত সফর ও মহড়া অঞ্চলের সামুদ্রিক গতিবিদ্যাকে নতুনভাবে গঠন করতে পারে, যা আন্তর্জাতিক নৌ নীতি ও নিরাপত্তা কাঠামোর ওপর দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব ফেলবে।



