দীর্ঘ সময়ের রাজনৈতিক অস্থিরতার পর ১২ ফেব্রুয়ারি বৃহস্পতিবার রাত একটায় কুমিল্লা জেলায় ১১টি জাতীয় সংসদ আসনের ফলাফল প্রকাশিত হয়। জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তা ও জেলা প্রশাসক মু. রেজা হাসানের স্বাক্ষরিত ফলাফল বিবরণী অনুসারে, ভোটগ্রহণ শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন হয়েছে এবং নারী ও তরুণদের ব্যাপক উপস্থিতি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার পুনর্জাগরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
এই নির্বাচনে বিএনপি ৮টি আসনে জয়লাভ করে, আর বাকি তিনটি আসনে জামায়াত-এ-ইসলামি, এনসিপিআই এবং বিএনপির বিদ্রোহী স্বতন্ত্র প্রার্থী প্রত্যেকটি এক করে জায়গা পায়। বিশেষ করে কুমিল্লা-৭ (চান্দিনা) আসনে বিএনপির স্বতন্ত্র প্রার্থী আতিকুল আলম শাওনের বিজয় নজরকাড়া, যেখানে তিনি পাঁচবারের সাবেক এমপি ড. রেদওয়ান আহমেদকে পরাজিত করে ৩৬ বছর বয়সের তরুণ প্রার্থী হিসেবে জয়লাভ করেন।
কুমিল্লা-১ (দাউদকান্দি‑মেঘনা) আসনে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন ১,৪১,৪৪০ ভোট নিয়ে জয়ী হন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াত-এ-ইসলামির প্রার্থী দাউদকান্দি উপজেলা জামায়াতের আমির মনিরুজ্জামান বাহালুল ৯৪,৮৪৫ ভোট পেয়ে দ্বিতীয় স্থানে শেষ হন, ফলে ভোটের ব্যবধান ৪৬,৫৯৫।
কুমিল্লা-২ (হোমনা‑তিতাস) আসনে বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক (কুমিল্লা বিভাগ) অধ্যক্ষ মো. সেলিম ভূইয়া ৭৭,৩৭ ভোটে সিংহাসন দখল করেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন বিএনপির বিদ্রোহী স্বতন্ত্র প্রার্থী দলের চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া, যিনি সাবেক এপিএস ইঞ্জিনিয়ার আব্দুল মতিন খানকে ৬৩,৪৫ ভোটে পরাজিত করে দ্বিতীয় স্থান অর্জন করেন; ভোটের পার্থক্য ১৩,৯৯২।
কুমিল্লা-৩ (মুরাদনগর) আসনে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান কাজী শাহ মোফাজ্জল হোসেন কায়েকোবাদ ১,৫৯,২৯১ ভোট নিয়ে জয়ী হন। তার সবচেয়ে কাছের প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন জামায়াত-এ-ইসলামির প্রার্থী, কুমিল্লা উত্তর জেলা কর্মপরিষদ সদস্য ও মুরাদনগর উপজেলা পরিষদের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান ইউসুফ হাকিম সোহেল, যিনি ১,০৯,৫৯৯ ভোট পেয়েছেন; ফলে ভোটের ব্যবধান ৪৯,৬৯২।
কুমিল্লা-৪ (দেবিদ্বার) আসনে ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী ও এনসিপিআইয়ের দক্ষিণাঞ্চলীয় মুখ্য সংগঠক হাসনাত আবদুল্লাহ ১,৬৬,৫৮৩ ভোট সংগ্রহ করে বিজয়ী হন। এই ফলাফল জোটের শক্তি এবং এনসিপিআইয়ের স্থানীয় সংগঠনের কার্যকারিতা নির্দেশ করে।
বাকি সাতটি আসনের ফলাফল যদিও বিস্তারিতভাবে প্রকাশিত হয়নি, তবে জানা যায় যে বিএনপির স্বতন্ত্র প্রার্থী ও অন্যান্য জোটের প্রার্থীরা প্রত্যেকটি এক করে আসনে জয়লাভ করেছে। এই ফলাফলগুলো দেশের রাজনৈতিক মানচিত্রে নতুন গতিবিধি সৃষ্টি করবে বলে বিশ্লেষকরা অনুমান করছেন।
প্রতিপক্ষের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা যায়, জামায়াত-এ-ইসলামি ও এনসিপিআই তাদের নিজস্ব ভিত্তি বজায় রাখতে সক্ষম হয়েছে, যদিও তাদের ভোটের সংখ্যা প্রধানত জোটের সমর্থনের ওপর নির্ভরশীল। অন্যদিকে, বিএনপির বিদ্রোহী স্বতন্ত্র প্রার্থীরা কিছু আসনে স্বতন্ত্রভাবে জয়লাভ করে পার্টির অভ্যন্তরীণ বিভাজনের পরেও নির্বাচনী শক্তি প্রদর্শন করেছে।
এই ফলাফলগুলো পরবর্তী রাজনৈতিক আলোচনার ভিত্তি হবে। সংসদীয় কাজের সূচনা, সরকার গঠন ও নীতি নির্ধারণে কুমিল্লা থেকে আসা প্রতিনিধিদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হবে। বিশেষ করে কুমিল্লা-৭-এ নতুন মুখ শাওনের উপস্থিতি তরুণ প্রজন্মের রাজনৈতিক অংশগ্রহণ বাড়াতে পারে এবং ভবিষ্যতে পার্টি কাঠামোর পুনর্গঠনেও প্রভাব ফেলতে পারে।
সামগ্রিকভাবে, কুমিল্লা জেলায় অনুষ্ঠিত এই নির্বাচন দেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার পুনর্জাগরণে একটি মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হবে। ভোটগ্রহণের শান্তিপূর্ণ পরিবেশ, উচ্চ ভোটার টার্নআউট এবং বিভিন্ন বয়সের অংশগ্রহণকারী এই ফলাফলকে আরও বৈধতা প্রদান করেছে। পরবর্তী সময়ে নির্বাচিত প্রতিনিধিরা তাদের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন এবং স্থানীয় উন্নয়ন প্রকল্পে মনোনিবেশ করবে, যা কুমিল্লার রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিবেশকে নতুন দিশা দিতে পারে।



