ভ্যালেন্টাইন ডে-তে প্রায়শই মানুষ বিশ্বাস করে যে কোনো এক জায়গায় “দ্য ওয়ান” নামে একটি নিখুঁত সঙ্গী অপেক্ষা করছে। এই ধারণা সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক গবেষণার বিষয়বস্তু হয়ে দাঁড়িয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে অ্যাংলিয়া রাসকিন ইউনিভার্সিটিতে সামাজিক মনোবিজ্ঞানের অধ্যাপক বিরেন স্বামী এই বিষয়টি বিশ্লেষণ করেছেন।
প্রাচীন গ্রীসে প্লেটো এক সময় মানুষকে চারটি হাত, চারটি পা ও দুইটি মুখসহ সম্পূর্ণ সত্তা হিসেবে কল্পনা করেন। তিনি দাবি করেন যে জিউস এই সত্তাগুলোকে অর্ধেক করে ভাগ করে দিয়েছিল, ফলে প্রতিটি অর্ধেক তার অপর অর্ধেকের সন্ধানে পৃথিবী জুড়ে ঘুরে বেড়ায়। এই মিথটি আধুনিক সোলমেটের রোমান্টিক ব্যাখ্যার ভিত্তি হিসেবে কাজ করে।
মধ্যযুগে ট্রোবাডোরা ও আর্থুরীয় কাহিনীগুলো “কোর্টলি লাভ” নামে এক রূপকথা গড়ে তুলেছিল। ল্যান্সেলটের গুইনেভারের প্রতি নিষ্ঠা, যা প্রায়শই প্রকাশ্যে স্বীকার করা কঠিন ছিল, সেই সময়ের প্রেমকে এক ধরনের উচ্চতর আত্মত্যাগের রূপে উপস্থাপন করেছিল। এই রীতি একক সঙ্গীর প্রতি অটুট নিবেদনকে আদর্শ হিসেবে প্রচার করেছিল।
পুনর্জাগরণকালে শেক্সপিয়ার “স্টার-ক্রসড লাভার্স” নিয়ে লিখেছিলেন, যেখানে দুইজনের মধ্যে গভীর সংযোগ সত্ত্বেও পারিবারিক, আর্থিক বা ভাগ্যের বাধা তাদের আলাদা করে দেয়। এই থিমটি প্রেমের পথে মহাবিশ্বের হস্তক্ষেপের ধারণা জোরদার করে, যা আজকের সোলমেটের রোমান্সকে অতিরিক্ত নাটকীয়তা যোগায়।
হলিউডের চলচ্চিত্র ও রোমান্স উপন্যাসগুলো এই রোমান্টিক চিত্রকে আরও জনপ্রিয় করে তুলেছে। আধুনিক দর্শকরা প্রায়শই স্ক্রিনে দেখা নিখুঁত জুটি ও তাদের অমোঘ মিলনকে বাস্তব জীবনের মডেল হিসেবে গ্রহণ করে। ফলে সোলমেটের ধারণা জনসাধারণের মধ্যে গভীরভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
বিরেন স্বামী, যিনি ক্যামব্রিজের অ্যাংলিয়া রাসকিন ইউনিভার্সিটিতে সামাজিক মনোবিজ্ঞানের অধ্যাপক, আধুনিক ইউরোপীয় প্রেমের ধারণা কীভাবে মধ্যযুগীয় রূপকথা থেকে উদ্ভূত হয়েছে তা গবেষণা করেছেন। তিনি উল্লেখ করেন যে ল্যান্সেলট ও গুইনেভারের গল্পগুলো একক সঙ্গীর ধারণা প্রথমবারের মতো জনপ্রিয় করে।
স্বামী বলেন, ঐ সময়ের গল্পগুলো মানুষকে এক জীবনের সঙ্গী বেছে নেওয়ার ধারণা দিয়ে প্রভাবিত করেছিল। এর আগে ইউরোপে প্রেমের সম্পর্ক তুলনামূলকভাবে স্বেচ্ছাচারী ও বহুমুখী ছিল, এবং যৌন সম্পর্কের বাইরে বন্ধুত্বপূর্ণ সংযোগের ওপর বেশি জোর দিত।
শিল্পায়নের পূর্বে গ্রামীণ সমাজে মানুষ প্রায়শই একই সম্প্রদায়ে বসবাস করত, যেখানে সামাজিক বন্ধন ও পারিবারিক ঐতিহ্য প্রেমের পছন্দকে নির্ধারণ করত। তবে শিল্পায়নের ফলে জনসংখ্যা শহরে স্থানান্তরিত হওয়ায় ব্যক্তিগত স্বাধীনতা বৃদ্ধি পায় এবং প্রেমের পছন্দে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি উদ্ভব হয়।
এই পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে মনোবিজ্ঞানীরা সোলমেটের বৈজ্ঞানিক ভিত্তি অনুসন্ধান শুরু করেন। গবেষণায় দেখা যায় যে মস্তিষ্কের নির্দিষ্ট অঞ্চলে পারস্পরিক আকর্ষণ ও সাদৃশ্যের সময় সক্রিয়তা বৃদ্ধি পায়, তবে এটি কোনো একক ব্যক্তিকে “নির্ধারিত সঙ্গী” হিসেবে চিহ্নিত করে না।
সাম্প্রতিক গবেষণায় জোড়ার মধ্যে শেয়ার করা মূল্যবোধ, যোগাযোগের ধরন ও আবেগীয় সমর্থনকে দীর্ঘস্থায়ী সম্পর্কের মূল উপাদান হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এই ফলাফলগুলো নির্দেশ করে যে সোলমেটের ধারণা রোমান্টিক আদর্শের চেয়ে বেশি বাস্তবিক সামঞ্জস্যের উপর নির্ভরশীল।
বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা যায়, সোলমেটের সন্ধান মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে যদি তা অযৌক্তিক প্রত্যাশা তৈরি করে। গবেষকরা পরামর্শ দেন যে ব্যক্তিগত বিকাশ, পারস্পরিক সম্মান ও যোগাযোগের দক্ষতা বাড়ানোর দিকে মনোযোগ দেওয়া উচিত, rather than waiting for a predestined match.
প্রেমের ইতিহাস ও আধুনিক গবেষণার বিশ্লেষণ থেকে স্পষ্ট যে সোলমেটের ধারণা সাংস্কৃতিক গল্প ও মিডিয়ার ফল, কিন্তু বৈজ্ঞানিকভাবে এটি কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি হিসেবে নির্ধারিত নয়। পাঠকরা কি নিজের অভিজ্ঞতা ও মূল্যবোধের ভিত্তিতে সঙ্গী নির্বাচনকে আরও বাস্তবিকভাবে বিবেচনা করবেন?



