কোভিড-১৯ লকডাউনের প্রথম মাসে, কেলি মিডিনা এনোস নামের এক মা তার ছয় মাসের শিশুর আচরণে অপ্রত্যাশিত সমস্যার মুখোমুখি হন। শিশুটি হঠাৎ করে আঘাত করতে শুরু করে এবং তীব্র রাগের প্রকাশ দেখায়, ফলে মা নিজেকে হারিয়ে যাওয়া অনুভব করেন। এই পরিস্থিতি তাকে অনলাইন প্ল্যাটফর্মে ‘জেন্টল প্যারেন্টিং’ নামে পরিচিত একটি পদ্ধতি অনুসন্ধান করতে উদ্বুদ্ধ করে।
টিকটকে দেখা ভিডিওগুলোতে জেন্টল প্যারেন্টিংকে প্রচলিত শাসনমূলক পদ্ধতির থেকে ভিন্নভাবে উপস্থাপন করা হয়। শাসনমূলক পদ্ধতিতে বাবা-মা স্পষ্ট নিয়ম আর ফলাফল নির্ধারণ করে, যেখানে জেন্টল প্যারেন্টিং শিশুর অনুভূতিকে স্বীকার করে শান্তভাবে প্রতিক্রিয়া জানাতে জোর দেয়। এই পদ্ধতিতে ‘না’ বা ‘করো না’ এর বদলে শিশুকে বিকল্প প্রদান করা হয়, যাতে সে নিজের সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারে।
একজন শিশু মনোবিজ্ঞানী ব্যাখ্যা করেন, জেন্টল প্যারেন্টিং মানে শিশুকে অতিরিক্ত মিষ্টি বা আইসক্রিমের মতো সবকিছু দেয়া নয়; বরং এটি শিশুর প্রতি সম্মান ও দয়ার ভিত্তিতে আচরণ গড়ে তোলার প্রচেষ্টা। মা কেলি এই ধারণা নিয়ে গবেষণা করে দেখেন যে, তার পূর্বের অভিজ্ঞতায় ছাড়া অন্য কোনো পদ্ধতি ছিল না, তবে নতুন পদ্ধতি তার মানসিক লক্ষ্যগুলোর সঙ্গে মানানসই বলে তিনি তা গ্রহণ করেন।
প্রথমে অনলাইনে দেখার মতো সহজ মনে হলেও বাস্তবে কেলি উল্লেখ করেন যে, জেন্টল প্যারেন্টিংকে দৈনন্দিন জীবনে প্রয়োগ করা সহজ নয়। তিনি প্রতিটি কথার পেছনে ভাবতে থাকেন এবং নিজের সিদ্ধান্তে দ্বিধা করেন, ফলে মাতৃত্বের ক্লান্তি বাড়ে। তবু তিনি ধারাবাহিকভাবে চেষ্টা চালিয়ে যান, কারণ তিনি বিশ্বাস করেন যে শিশুর সঙ্গে সম্পর্কের গুণগত মান উন্নত হবে।
কেলি তার শিশুর সঙ্গে কথোপকথনের পদ্ধতিতে বড় পরিবর্তন আনে। তিনি ‘না’, ‘থামো’ এবং ‘করো না’ শব্দগুলোকে বাদ দিয়ে, শিশুকে কী করা উচিত তা নির্দেশ করার জন্য ইতিবাচক বাক্য ব্যবহার করেন। উদাহরণস্বরূপ, যখন শিশুটি ঝাঁপিয়ে পড়তে চায়, তিনি বলেন, “মা তোমাকে নিচে নামতে সাহায্য করবে”, যা শিশুকে নিরাপদে কাজ করার সুযোগ দেয়।
শিশুটি সবসময়ই নির্দেশ মেনে চলে না; কখনও কখনও সে বিরক্তিকর আচরণ করে। এমন সময়ে কেলি নিজেকে স্মরণ করিয়ে দেন যে, শিশুর এই ধরনের আচরণ স্বাভাবিক এবং সাধারণ। তিনি এই দৃষ্টিভঙ্গি বজায় রাখার মাধ্যমে নিজের মানসিক চাপ কমিয়ে রাখেন এবং শিশুর সঙ্গে আরও শান্তিপূর্ণ পরিবেশ গড়ে তোলেন।
মা তার শিশুকে ‘নরম হাত’ ধারণা শেখান, যাতে শিশুটি শারীরিকভাবে সংবেদনশীল হয়ে অন্যের সঙ্গে মৃদুভাবে আচরণ করে। এই পদ্ধতি শিশুর সামাজিক দক্ষতা গড়ে তুলতে সহায়তা করে এবং ভবিষ্যতে সহানুভূতিশীল আচরণকে উৎসাহিত করে। কেলি জানান, যদিও শিশুটি সব সময়ই এই নিয়ম মেনে চলে না, তবু ধারাবাহিক স্মরণে শিশুর আচরণে ধীরে ধীরে উন্নতি লক্ষ্য করা যায়।
কেলি উল্লেখ করেন, জেন্টল প্যারেন্টিং গ্রহণের পর তার নিজের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে। তিনি আর ‘না’ শব্দের মাধ্যমে শিশুকে দমন করেন না, ফলে তার নিজের উদ্বেগের মাত্রা কমে যায়। এছাড়া, শিশুর সঙ্গে সংলাপের গুণগত মান বাড়ার ফলে মা-শিশু সম্পর্ক আরও মজবুত হয়েছে।
এই পদ্ধতি গ্রহণের সময় কেলি স্বীকার করেন যে, প্রথমে তার জন্য এটি মানসিকভাবে ক্লান্তিকর ছিল। তবে ধারাবাহিক অনুশীলন এবং নিজের ভুলগুলো থেকে শিখে তিনি ধীরে ধীরে আত্মবিশ্বাস অর্জন করেন। তিনি পরামর্শ দেন যে, নতুন পিতামাতারা যদি জেন্টল প্যারেন্টিং চেষ্টা করতে চান, তবে প্রথমে ছোট ছোট পরিবর্তন দিয়ে শুরু করা উচিত, যেমন ‘না’ শব্দের পরিবর্তে ইতিবাচক বিকল্প প্রদান করা।
শিশুর বিকাশে সম্মান ও দয়ার ভিত্তিতে গড়ে তোলা পরিবেশের গুরুত্ব বাড়ছে, বিশেষ করে লকডাউনের মতো অপ্রত্যাশিত পরিস্থিতিতে। কেলির অভিজ্ঞতা দেখায় যে, সামাজিক মিডিয়ার মাধ্যমে নতুন পিতামাতা পদ্ধতি শিখে বাস্তব জীবনে প্রয়োগ করা সম্ভব, যদিও তা সহজ নয়।
অবশেষে, কেলি জোর দিয়ে বলেন যে, শিশুর স্বাভাবিক আচরণকে স্বীকার করা এবং তার সঙ্গে ধৈর্য্যপূর্ণভাবে যোগাযোগ করা পিতামাতার জন্য সবচেয়ে বড় সাফল্য। তিনি আশা করেন যে, আরও বেশি মা-বাবা এই পদ্ধতি গ্রহণ করে তাদের সন্তানদের সঙ্গে সুস্থ ও সমন্বিত সম্পর্ক গড়ে তুলতে পারবেন।
আপনার সন্তানকে কীভাবে আরও সম্মানজনক ও দয়ালুভাবে গড়ে তোলা যায়, তা নিয়ে আপনার কী মতামত? মন্তব্যে শেয়ার করুন।



