বেরলিন আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের (বেরলিনালে) প্রধান প্রোগ্রামে ইসরায়েলি লেখক‑নির্দেশক আসাফ মাখনেসের প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য ছবি ‘Where To?’ প্রদর্শিত হয়েছে। ছবিটি দু’জনের অদ্ভুত সাক্ষাৎকে কেন্দ্র করে, যেখানে একটি ফিলিস্তিনি উবার চালক ও একটি ইসরায়েলি তরুণের মধ্যে দুই বছরের দীর্ঘ সময়ে গড়ে ওঠা মানবিক সম্পর্ককে অনুসন্ধান করা হয়েছে।
হাসান, ৫৫ বছর বয়সী ফিলিস্তিনি উবার চালক, যাকে ফিলিস্তিনি অভিনেতা ইহাব সালামি অভিনয় করেছেন, বার্লিনের রাতের পার্টি দৃশ্যের মাঝখানে গাড়ি চালান। এক শীতল সন্ধ্যায় ২৫ বছর বয়সী ইসরায়েলি যাত্রী আমির, যাকে ইসরায়েলি অভিনেতা ইদো টাকো চিত্রিত করেছেন, তার গাড়িতে চড়ে। আমির নিজের পরিচয় ও যৌনতা অনুসন্ধানের পথে, বাড়ি থেকে দূরে, এই যাত্রা শুরু করে।
দুই বছর ধরে একই রুটে একাধিকবার একসাথে গাড়ি চালানোর পর, হাসান ও আমিরের মধ্যে অপ্রত্যাশিত বন্ধন গড়ে ওঠে। ছবিটি এই সম্পর্ককে কেন্দ্র করে ট্রমা, পুরুষত্ব, কুইয়ার পরিচয় এবং ইসরায়েলি‑ফিলিস্তিনি সম্পর্কের জটিলতা তুলে ধরে। উভয়ের কথোপকথনে ব্যক্তিগত ব্যথা ও বিচ্ছিন্নতার ছায়া দেখা যায়, যা দর্শকদের গভীরভাবে স্পর্শ করে।
হাসানের পরিবারিক পরিস্থিতি ছবিতে স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে। তার বড় মেয়ে জার্মান বয়ফ্রেন্ডের সঙ্গে বিবাহের ইচ্ছা প্রকাশ করে, ফলে দু’জনের মধ্যে দূরত্ব বাড়ে। এই পারিবারিক বিচ্ছিন্নতা হাসানকে নিজের অতীতের কষ্টের সঙ্গে মোকাবিলা করতে বাধ্য করে, বিশেষ করে যখন আমির তার হৃদয়ভঙ্গের কথা শেয়ার করে।
অন্যদিকে, আমির নিজের আত্ম-অন্বেষণে ব্যর্থতার ভয় ও যৌন পরিচয়ের প্রশ্নে আটকে থাকে। বার্লিনের বহুমুখী পরিবেশে সে নিজের সীমা পরীক্ষা করে, তবে হাসানের সঙ্গে ভাগ করা রাইডগুলোতে সে এক ধরনের মানসিক সমর্থন পায়, যা তার আত্মবিশ্বাসকে পুনর্গঠন করে।
নির্দেশকের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ছবির মূল অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করেছে। মাখনেস বার্লিনে শীতের এক রাতে ফিলিস্তিনি উবার চালকের গাড়িতে চড়ে, যখন দুজনের মধ্যে শব্দহীন বোঝাপড়া জন্ম নেয়, তখন তিনি এই মুহূর্তকে কল্পনা করেন যে যদি এই সাক্ষাৎ পুনরাবৃত্তি হয় তবে কী হতে পারে। এই অভিজ্ঞতা ছবির কাহিনীর ভিত্তি গড়ে তুলেছে।
‘Where To?’-এর বিশ্ব বিক্রয় লাকি নাম্বার (Lucky Number) পরিচালনা করছে, যা আন্তর্জাতিক বাজারে ছবির প্রচারকে ত্বরান্বিত করবে। ছবির থিম ও চরিত্রের গভীরতা আন্তর্জাতিক দর্শকদের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করতে সক্ষম বলে আশা করা হচ্ছে।
চলচ্চিত্রটি আধুনিক সময়ের সামাজিক ও রাজনৈতিক টানাপোড়েনকে সূক্ষ্মভাবে উপস্থাপন করে, যেখানে ইসরায়েলি ও ফিলিস্তিনি মানুষের দৈনন্দিন জীবনের মিথস্ক্রিয়া একটি নতুন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা যায়। এই মিথস্ক্রিয়া কেবল ব্যক্তিগত স্তরে নয়, বরং বৃহত্তর মানবিক সংযোগের প্রতীক হিসেবে কাজ করে।
বেরলিনের রাত্রিকালীন রাস্তায় গাড়ির আলো ও শহরের গুঞ্জন ছবির পটভূমি গঠন করে, যা চরিত্রদের অভ্যন্তরীণ অশান্তিকে প্রতিফলিত করে। উবারের গ্লাসের পিছনে দেখা প্রতিফলনগুলো তাদের আত্ম-অন্বেষণের প্রতীক হয়ে ওঠে।
‘Where To?’-এর গল্পের গতি ধীরে ধীরে বিকশিত হয়, যেখানে প্রতিটি রাইডে নতুন কথোপকথন ও আবেগের স্তর যোগ হয়। এই ধীর গতি দর্শকদেরকে চরিত্রগুলোর অন্তর্নিহিত দুঃখ ও আশা অনুভব করতে সাহায্য করে।
চলচ্চিত্রের সঙ্গীত ও দৃশ্যমান নকশা বার্লিনের বহুসাংস্কৃতিক পরিবেশকে তুলে ধরে, যা দর্শকের জন্য একটি সমৃদ্ধ ভিজ্যুয়াল অভিজ্ঞতা তৈরি করে। ছবির রঙের প্যালেট শীতল নীল ও ধূসর রঙে গঠিত, যা শীতের একাকীত্বের সঙ্গে মানসিক উষ্ণতার বৈপরীত্যকে জোর দেয়।
বেরলিনালে ‘Where To?’ প্রদর্শিত হওয়ায় এটি আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র সমালোচকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে এবং একই সঙ্গে বাংলা ভাষাভাষী দর্শকদের জন্য নতুন দৃষ্টিকোণ উপস্থাপন করে। ছবির মাধ্যমে মানবিক সংযোগের শক্তি ও সীমা উন্মোচিত হয়, যা আজকের বিশ্বে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক।



