ময়মনসিংহের ভালুকা উপজেলায় ১৩ই জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোটগ্রহণের দিন, লেহাবৈ বরাদী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে অপ্রত্যাশিত ঘটনা ঘটেছে। পাঁচজন তরুণ ব্যালট পেপারে সিল লাগিয়ে বক্সে ভর্তি করার চেষ্টা করছিল, যা ভিডিওতে ধরা পড়ে সামাজিক মাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। এই ঘটনার ফলে কেন্দ্রে ভোটগ্রহণ অস্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে যায় এবং নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় প্রশ্ন উত্থাপিত হয়।
ভিডিওতে দেখা যায় দুইজন যুবক ব্যালট পেপারে সিল প্রয়োগ করছেন, আর বাকি তিনজন সিল করা পেপারগুলোকে ভোটবক্সে ঢুকিয়ে দিচ্ছেন। সিলের জন্য ব্যবহৃত উপকরণ ও পদ্ধতি স্পষ্ট না হলেও, তাদের কাজের ফলে ভোটের গোপনীয়তা ও স্বচ্ছতা বিপন্ন হয়েছে বলে মন্তব্য উঠে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই দৃশ্য দ্রুতই ভাইরাল হয়ে ওঠে, ফলে স্থানীয় প্রশাসন ও নির্বাচন কমিশনের দৃষ্টি আকর্ষণ করে।
ঘটনাটি ঘটেছে ময়মনসিংহের ভালুকা উপজেলার মেদুয়ারী ইউনিয়নের লেহাবৈ বরাদী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে, যা ঐ নির্বাচনী এলাকার প্রধান ভোটগ্রহণ কেন্দ্র। কেন্দ্রটি ঐ দিন প্রচুর ভোটারকে স্বাগত জানাচ্ছিল, তবে অল্প সময়ের মধ্যে অস্বাভাবিক কার্যকলাপের কারণে নিরাপত্তা ও নিয়ন্ত্রণের প্রশ্ন তোলা হয়। স্থানীয় পুলিশ ও নির্বাচনী পর্যবেক্ষকরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কাজ করেন।
প্রাথমিকভাবে সিলিং কাজের প্রকাশে ভোটগ্রহণ প্রায় অর্ধ ঘন্টার জন্য বন্ধ করা হয়। বন্ধের সময় নির্বাচনী কর্মীরা পরিস্থিতি মূল্যায়ন করে, সিসিটিভি রেকর্ড পর্যালোচনা করে এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করে। বিশ্লেষণের পর ভোটগ্রহণ পুনরায় শুরু হয়, তবে এই সময়ে কিছু ভোটারকে পুনরায় কেন্দ্রে ফিরিয়ে আনতে অতিরিক্ত প্রচেষ্টা করা হয়।
ঘটনার পর কেন্দ্রের প্রিসাইডিং কর্মকর্তা মোহাম্মদ হাফিজ উদ্দিনকে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। তার পরিবর্তে সহকারী প্রিসাইডিং কর্মকর্তা আবু হেনাকে অস্থায়ীভাবে দায়িত্ব অর্পণ করা হয়। এই পদক্ষেপটি নির্বাচন কমিশনের তৎক্ষণাৎ নির্দেশনা অনুসারে নেওয়া হয়, যাতে ভোটগ্রহণের স্বচ্ছতা ও আইনগততা বজায় থাকে। নতুন দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা দ্রুতই ভোট প্রক্রিয়া চালিয়ে যান।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফিরোজ হোসেন সিসিটিভি ক্যামেরা ফুটেজ দেখার পর সঙ্গে সঙ্গে পুলিশ ও ম্যাজিস্ট্রেটকে ঘটনাস্থলে পাঠান। তদন্তে দেখা যায় প্রিসাইডিং কর্মকর্তার তত্ত্বাবধানে কিছু দুর্বলতা ছিল, যা সিলিং কাজের সুযোগ তৈরি করে। আইনগত দৃষ্টিকোণ থেকে এই দুর্বলতা নির্বাচন প্রক্রিয়ার বৈধতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে, ফলে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া হয়।
ফিরোজ হোসেনের মতে, পাঁচজন তরুণের কাজের ফলে প্রায় ৫০ থেকে ১০০টি ব্যালটে সিল লাগানো হতে পারে। নির্বাচনী আইন অনুযায়ী, যদি ব্যালটে সহকারী প্রিসাইডিং কর্মকর্তার সিল ও স্বাক্ষর না থাকে, তবে তা অবৈধ হিসেবে গণ্য হয়। অবৈধ ব্যালটের গণনা করা নিষিদ্ধ, এবং এমন ব্যালটের ফলাফল ভোটের মোট সংখ্যায় অন্তর্ভুক্ত করা হয় না।
অবৈধ ব্যালটের বিষয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় এবং সেগুলো গণনা থেকে বাদ দেওয়া হবে বলে জানানো হয়। কেন্দ্রে উপস্থিত কর্মকর্তারা অবৈধ ব্যালটের সংখ্যা নির্ধারণের জন্য অতিরিক্ত যাচাই প্রক্রিয়া চালু করেন, তবে ফলাফল প্রকাশের আগে ভোটারদের পুনরায় কেন্দ্রে নিয়ে আসা নিশ্চিত করা হয়। এই পদক্ষেপগুলো ভোটারদের আস্থা বজায় রাখতে এবং নির্বাচনের স্বচ্ছতা রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হয়।
এই ঘটনা নির্বাচনী প্রক্রিয়ার প্রতি জনসাধারণের আস্থা ক্ষুণ্ন করতে পারে, তাই রাজনৈতিক দলগুলোও বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। তারা নির্বাচনী কর্মকর্তাদের ন্যায়সঙ্গত ও স্বচ্ছ কাজের দাবি করে এবং তদারকি বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছে। নির্বাচন কমিশন এই উদ্বেগের প্রতি সাড়া দিয়ে তদারকি দল গঠন, সিসিটিভি পর্যবেক্ষণ শক্তিশালীকরণ এবং ভবিষ্যৎ নির্বাচনে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা প্রয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। অবশেষে, অবৈধ ব্যালট বাদ দিয়ে সঠিক গণনা নিশ্চিত করা হবে, যা ফলাফলের বৈধতা ও স্বচ্ছতা রক্ষার মূল ভিত্তি হবে।



