ক্যারিবিয়ান সমুদ্রের প্রবালপ্রাচীরের বাস্তুতন্ত্রে শীর্ষ শিকারীর হ্রাস এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবের ফলে খাদ্যশৃঙ্খল পূর্বের তুলনায় ছোট হয়ে যাচ্ছে, গবেষণায় এ বিষয়টি প্রকাশ পেয়েছে। এই পরিবর্তন সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য এবং প্রবালের স্বাস্থ্যের ওপর দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব ফেলতে পারে।
একটি আন্তর্জাতিক গবেষণা দল ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে একটি বৈজ্ঞানিক জার্নালে তাদের ফলাফল প্রকাশ করেছে। গবেষণার নেতৃত্বে ছিলেন ক্যারিবিয়ান সমুদ্রবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের প্রধান বিজ্ঞানী এবং যুক্তরাষ্ট্রের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ইকোলজি বিভাগ। গবেষণায় ১৯৯০ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত বিভিন্ন প্রবালপ্রাচীরের মাছের জনসংখ্যা ও তাদের পুষ্টি স্তরের তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
ডেটা সংগ্রহের জন্য গবেষকরা বহু বছর ধরে পরিচালিত সমুদ্রসীমা জরিপ, ডাইভিং পর্যবেক্ষণ এবং স্থিতিশীল আইসোটোপ বিশ্লেষণ ব্যবহার করেছেন। আইসোটোপের মাধ্যমে মাছের খাদ্যাভ্যাস ও টফিক স্তর নির্ধারণ করা সম্ভব হয়েছে, যা খাদ্যশৃঙ্খলের দৈর্ঘ্য মাপার মূল সূচক।
ফলাফল দেখায় যে, প্রবালপ্রাচীরের গড় টফিক স্তর ১৯৯০-এর দশকে প্রায় ৪.২ থেকে ২০২৪ সালে ৩.১ এ নেমে এসেছে। অর্থাৎ, শীর্ষ শিকারী থেকে নিম্ন স্তরের শিকারীর মধ্যবর্তী স্তরগুলো উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। এই হ্রাসের প্রধান কারণ হিসেবে বড় শিকারী মাছের অতিরিক্ত শিকারের পাশাপাশি সমুদ্রের তাপমাত্রা বৃদ্ধিকে চিহ্নিত করা হয়েছে।
বৃহৎ শিকারী মাছ, যেমন গ্রুপার এবং শার্ক, তাদের সংখ্যা হ্রাস পেয়েছে, ফলে ছোট মাছ ও প্ল্যাঙ্কটন খাওয়া প্রজাতির সংখ্যা বেড়েছে। একই সঙ্গে, প্রবালের কাঠামোগত ক্ষয় এবং শৈবালের অতিবৃদ্ধি দেখা দিয়েছে, যা ছোট মাছের জন্য নতুন বাসস্থান তৈরি করেছে কিন্তু বড় শিকারীর জন্য উপযুক্ত শিকারের সুযোগ কমিয়ে দিয়েছে।
প্রবালপ্রাচীরের বাস্তুতন্ত্রে এই পরিবর্তন শৈবালের আচ্ছাদন বাড়িয়ে তুলেছে, ফলে তরুণ প্রবালের বৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হয়েছে। গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে যে, শৈবালের আধিক্য প্রবালের জন্য প্রয়োজনীয় সূর্যালোকের প্রবেশ কমিয়ে দেয় এবং ফলস্বরূপ প্রবালের পুনর্জন্মের হার হ্রাস পায়।
অঞ্চলভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, কিছু রিজার্ভে, যেখানে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কঠোর মাছ ধরা নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে, সেখানে টফিক স্তরের হ্রাস তুলনামূলকভাবে কম। অন্যদিকে, পর্যটন ও বাণিজ্যিক মাছ ধরা অধিক সক্রিয় এমন এলাকায় খাদ্যশৃঙ্খল দ্রুত সংক্ষিপ্ত হয়েছে।
এই ফলাফল অন্যান্য উষ্ণমণ্ডলীয় সমুদ্রের সঙ্গে তুলনা করলে দেখা যায়, ক্যারিবিয়ান অঞ্চলে টফিক স্তরের হ্রাসের হার প্রশান্ত মহাসাগরের তুলনায় বেশি তীব্র। তবে, আটলান্টিকের কিছু অংশে একই ধরণের প্রবণতা দেখা যায়, যা নির্দেশ করে যে জলবায়ু পরিবর্তন এবং অতিরিক্ত শিকারের প্রভাব বিশ্বব্যাপী সমুদ্রের খাদ্যশৃঙ্খলে প্রভাব ফেলছে।
খাদ্যশৃঙ্খলের সংক্ষিপ্ততা স্থানীয় মাছধরার আয় এবং পর্যটন শিল্পের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে। বড় শিকারী মাছের অভাবে ছোট মাছের বাজারমূল্য বাড়লেও, সামগ্রিক মাছের প্রজাতির বৈচিত্র্য হ্রাস পায়, যা দীর্ঘমেয়াদে মাছধরার টেকসইতা ক্ষুণ্ন করে।
বিশেষজ্ঞরা উল্লেখ করছেন যে, শীর্ষ শিকারী মাছের পুনরুদ্ধার এবং প্রবালপ্রাচীরের স্বাস্থ্যের রক্ষণাবেক্ষণের জন্য সমুদ্র সংরক্ষণ এলাকা (MPA) সম্প্রসারণ, শিকারের সীমাবদ্ধতা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের মোকাবিলায় গ্লোবাল উদ্যোগ জরুরি। এছাড়া, স্থানীয় সম্প্রদায়কে টেকসই মাছধরা পদ্ধতি গ্রহণে সচেতন করা প্রয়োজন।
প্রবালপ্রাচীরের খাদ্যশৃঙ্খল সংক্ষিপ্ত হওয়া একটি সতর্ক সংকেত, যা সমুদ্রের সামগ্রিক স্বাস্থ্যের অবনতি নির্দেশ করে। এই পরিবর্তনকে থামাতে এবং পুনরুদ্ধার করতে কী ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া উচিত, তা নিয়ে আপনার মতামত কী?



