২০২৫ সালের জুন মাসে আহমেদাবাদের কাছাকাছি এয়ার ইন্ডিয়া ফ্লাইট ১৭১ উড়ে গিয়ে বিধ্বস্ত হয়, যার ফলে ২৬০ জনের বেশি প্রাণ হারায় এবং মাত্র একজন যাত্রী বেঁচে থাকে। ইতালির প্রধান দৈনিক কোরিয়ারে দেলা সেরা এই ঘটনার পেছনে যান্ত্রিক ত্রুটি নয়, পাইলটের ইচ্ছাকৃত কাজের সম্ভাবনা তুলে ধরেছে। পত্রিকাটি উড়োজাহাজের ককপিটের স্পষ্ট ভয়েস রেকর্ডিং উল্লেখ করে, যেখানে জ্বালানি সরবরাহ বন্ধ করার কাজের দায়িত্ব একজন পাইলটের ওপর নির্দেশিত হয়েছে।
কোরিয়ারে দেলা সেরা প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উড়োজাহাজের দুই পাইলটের একজন জ্বালানি সুইচকে ‘কাট-অফ’ অবস্থায় সরিয়ে নিয়েছেন, যা প্রায় নিশ্চিতভাবে ইচ্ছাকৃত কাজ বলে অনুমান করা হচ্ছে। রেকর্ডিং থেকে স্পষ্ট হয় যে কোন পাইলট এই কাজটি সম্পন্ন করেছেন, তবে চূড়ান্ত তদন্তে পাইলট কমান্ডার সুমিত সভারওয়ালকে দোষারোপ করা হবে কিনা তা এখনও নির্ধারিত হয়নি।
এই বিধ্বস্ত ঘটনার ফলে সুমিত সভারওয়ালসহ উড়োজাহাজের দুইজন পাইলটের মৃত্যু হয়েছে, এবং বেঁচে থাকা একমাত্র যাত্রীকে জরুরি সেবা দ্রুত উদ্ধার করতে সক্ষম হয়। ঘটনাস্থলে ভারতীয় বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (DGCA) এখনও চূড়ান্ত তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করেনি, যদিও প্রাথমিক প্রতিবেদনগুলোতে জ্বালানি সুইচের অস্বাভাবিক অবস্থান উল্লেখ করা হয়েছে।
ইতালির পত্রিকাটি উল্লেখ করেছে, যুক্তরাষ্ট্রের বিমান নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা বোয়িং ৭৮৭ ড্রিমলাইনারের সিমুলেটর টেস্টে এমন কোনো যান্ত্রিক ত্রুটি শনাক্ত করেনি, যা একসঙ্গে দুটি ইঞ্জিন বন্ধ হওয়ার কারণ হতে পারে। এই বিশ্লেষণ অনুসারে, মানব হস্তক্ষেপ—ইচ্ছাকৃত হোক বা দুর্ঘটনাজনিত—ইউনিটের ব্যর্থতার একমাত্র যুক্তিসঙ্গত ব্যাখ্যা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
প্রাথমিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, উড্ডয়নের পরই ককপিটের ‘ফুয়েল কন্ট্রোল সুইচ’ ‘রান’ পজিশন থেকে ‘কাট-অফ’ পজিশনে সরিয়ে নেওয়া হয়। রেকর্ডিংয়ে শোনা যায়, এক পাইলট অন্যকে জিজ্ঞেস করে কেন জ্বালানি সরবরাহ বন্ধ করা হয়েছে, আর অন্য পাইলট তা অস্বীকার করে। এই সংলাপটি তদন্তকারীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সূত্র হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে, কারণ এটি সরাসরি পাইলটের সিদ্ধান্তের দিকে ইঙ্গিত করে।
সুমিত সভারওয়ালের পরিবার এবং ভারতীয় পাইলট অ্যাসোসিয়েশন পত্রিকায় উত্থাপিত দায়িত্বের অভিযোগের তীব্র সমালোচনা করেছে। তারা উড়োজাহাজের নির্মাতা, এয়ারলাইন এবং সংশ্লিষ্ট সিস্টেমের অন্যান্য দিকও সমানভাবে পরীক্ষা করার দাবি জানিয়েছে। এই অবস্থানটি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিমান নিরাপত্তা মানদণ্ডের পুনর্মূল্যায়নের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরছে।
ইতালি এবং ভারতের কূটনৈতিক সম্পর্কের প্রেক্ষাপটে, এই নতুন দাবি উভয় দেশের বিমান নিরাপত্তা সংস্থার মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোর সম্ভাবনা তৈরি করেছে। ইতালির বিমান নিরাপত্তা সংস্থা ইতালীয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে তথ্য শেয়ার করার ইচ্ছা প্রকাশ করেছে, যা দু’দেশের মধ্যে প্রযুক্তিগত সহযোগিতা শক্তিশালী করতে পারে। একই সঙ্গে, ভারতীয় সরকারও আন্তর্জাতিক বিমান সংস্থা (ICAO) এর সঙ্গে সমন্বয় বাড়িয়ে তদন্তের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
বিশ্বব্যাপী বিমান নিরাপত্তা সংস্থাগুলো এই ঘটনার পর্যালোচনা করে, পাইলটের প্রশিক্ষণ ও মনস্তাত্ত্বিক মূল্যায়নের গুরুত্ব পুনরায় জোর দিচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা উল্লেখ করেছেন, উচ্চ-ঝুঁকির উড়ানগুলিতে পাইলটের মানসিক স্বাস্থ্যের পর্যবেক্ষণ এবং জরুরি পরিস্থিতিতে স্পষ্ট প্রোটোকল প্রয়োগ করা অপরিহার্য।
DGCA আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে চূড়ান্ত তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশের পরিকল্পনা করেছে, যেখানে পাইলটের কাজের প্রকৃতি, যান্ত্রিক অবস্থা এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থার ত্রুটি বিশ্লেষণ করা হবে। প্রতিবেদনে যদি পাইলটের ইচ্ছাকৃত কাজ নিশ্চিত হয়, তবে এয়ারলাইন ও নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোকে সংশ্লিষ্ট শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
এই ঘটনাটি আন্তর্জাতিক বিমান নিরাপত্তা নীতি ও নিয়মাবলীর পুনর্বিবেচনার দরজা খুলে দিয়েছে, যেখানে মানবিক ত্রুটি এবং প্রযুক্তিগত ব্যর্থতার সমন্বয়কে কীভাবে মোকাবেলা করা হবে তা নিয়ে আলোচনা বাড়বে। শেষ পর্যন্ত, এয়ার ইন্ডিয়া ফ্লাইট ১৭১ বিধ্বস্তের প্রকৃত কারণ নির্ধারণই ভবিষ্যতে অনুরূপ দুর্ঘটনা রোধের মূল চাবিকাঠি হবে।



