বাংলাদেশ সরকার এবং মার্কিন সরকার সোমবার নতুন পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষর করে, যার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র থেকে আসা প্রায় ৪,৫০০ পণ্যের উপর কাস্টমস শুল্ক, অতিরিক্ত শুল্ক এবং নিয়ন্ত্রক শুল্ক সম্পূর্ণভাবে বাতিল করা হবে। এই পদক্ষেপটি সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে শুল্ক হ্রাসের অন্যতম বৃহৎ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত।
চুক্তির আওতায় ৪,৫০০ পণ্যের শুল্ক বাতিল স্বাক্ষরের তারিখ থেকেই কার্যকর হবে, ফলে এই পণ্যের আমদানি খরচ তৎক্ষণাৎ কমে যাবে। এই পণ্যগুলোর মধ্যে ইলেকট্রনিক্স, কৃষি যন্ত্রপাতি এবং অন্যান্য শিল্প পণ্য অন্তর্ভুক্ত, যদিও নির্দিষ্ট তালিকা চুক্তির সংযুক্তিতে উল্লেখ রয়েছে।
অতিরিক্তভাবে, আরেকটি ২,২১০ পণ্যের শুল্ক ধীরে ধীরে হ্রাসের পরিকল্পনা করা হয়েছে। এই পণ্যের জন্য শুল্কের হ্রাসের সময়সূচি ভিন্ন ভিন্ন, যা শিল্পের চাহিদা ও বাজারের গতি অনুযায়ী নির্ধারিত।
মার্কিন সরকার ১,৬৩৮টি বাংলাদেশি পণ্যের উপর প্রতিশোধমূলক শুল্ক বাতিলের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এতে গম, প্রাকৃতিক ফাইবার, লোহার ও ইস্পাত, খনিজ, ফার্মাসিউটিক্যাল, রাসায়নিক, প্লাস্টিক, কাঠ এবং মার্কিন কটন দিয়ে তৈরি পোশাক অন্তর্ভুক্ত। তবে এই পণ্যের উপর সাধারণ সর্বোত্তম জাতীয় (MFN) শুল্ক, যা গড়ে ১৬-১৭ শতাংশ, এখনও প্রযোজ্য থাকবে।
চুক্তির আরেকটি মূল দিক হল, মার্কিন সরকার বাংলাদেশি রপ্তানি পণ্যের পারস্পরিক শুল্ক হারকে এক শতাংশ কমিয়ে ১৯ শতাংশে নামিয়ে দিয়েছে। এই হ্রাসটি সোমবার স্বাক্ষরিত চুক্তির অংশ হিসেবে অফিস অফ দ্য ইউনাইটেড স্টেটস ট্রেড রিপ্রেজেন্টেটিভ (USTR) প্রকাশিত নথিতে বিস্তারিতভাবে উল্লেখ আছে, যেখানে HS কোডের ভিত্তিতে বিভিন্ন পণ্যের জন্য নির্দিষ্ট সময়সূচি দেওয়া হয়েছে।
২,২১০ পণ্যের মধ্যে ১,৫৩৮টির শুল্ক স্বাক্ষরের দিন থেকেই ৫০ শতাংশ কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। বাকি ৫০ শতাংশ শুল্ক সমান ভাগে চার বছর ধরে ধীরে ধীরে হ্রাস করা হবে এবং পঞ্চম বছরের জানুয়ারি ১ তারিখে সম্পূর্ণভাবে বাতিল হবে।
অবশিষ্ট ৬৭২ পণ্যের ক্ষেত্রে প্রথমে বিদ্যমান শুল্কের অর্ধেক অংশ বাতিল করা হবে, আর বাকি শুল্কটি পরবর্তী নয় বছর ধরে ধাপে ধাপে কমিয়ে দশম বছরে শূন্যে পৌঁছাবে। এই ধাপভিত্তিক হ্রাসের লক্ষ্য হল বাজারে স্বচ্ছতা বজায় রেখে রপ্তানি-আমদানি চক্রকে স্থিতিশীল করা।
মোট ৬,৭১০টি পণ্যের শুল্ক হ্রাসের পাশাপাশি, বাংলাদেশ ইতিমধ্যে যুক্তরাষ্ট্র থেকে ৪২২টি পণ্যের উপর কোনো শুল্ক আরোপ করে না, এবং এই অবস্থা পরিবর্তন হবে না। এই পণ্যগুলো মূলত উচ্চ চাহিদার পণ্য, যা পূর্বে থেকেই শুল্কমুক্ত।
অন্যদিকে, বর্তমান শুল্ক সূচি অনুযায়ী অতিরিক্ত ৩২৬টি পণ্যের উপর শুল্ক বজায় থাকবে। এই পণ্যগুলোতে কিছু কৃষি পণ্য ও নির্দিষ্ট শিল্প পণ্য অন্তর্ভুক্ত, যেগুলোর শুল্ক হ্রাসের কোনো পরিকল্পনা চুক্তিতে উল্লেখ নেই।
চুক্তিতে মূল্য সংযোজন কর (VAT) থেকে অব্যাহতি প্রদান করা হয়নি, ফলে এই পণ্যের উপর এখনও VAT আরোপিত থাকবে। এই বিষয়টি রপ্তানি-আমদানি ব্যবসায়িকদের জন্য অতিরিক্ত ব্যয় হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
শুল্ক হ্রাসের ফলে বাংলাদেশের আমদানি খরচ কমে উৎপাদন খরচ হ্রাসের সম্ভাবনা রয়েছে, বিশেষ করে ইলেকট্রনিক্স ও যন্ত্রপাতি শিল্পে। একইসঙ্গে, মার্কিন বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের প্রতিযোগিতা বাড়বে, যা রপ্তানি বৃদ্ধিতে সহায়তা করতে পারে। তবে শুল্কমুক্ত পণ্যের তালিকা সীমিত থাকায়, ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলোকে নতুন শুল্ক সূচি অনুযায়ী কৌশল পুনর্বিবেচনা করতে হবে।
এই চুক্তি দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ককে আরও দৃঢ় করবে এবং পরবর্তী কয়েক বছরে উভয় পক্ষের বাণিজ্য পরিমাণে উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি প্রত্যাশিত।



