বৈজ্ঞানিক গবেষণায় প্রকাশ পেয়েছে যে পৃথিবীর গহ্বরের কেন্দ্রীয় অংশে হাইড্রোজেনের বিশাল পরিমাণ থাকতে পারে, যা সমুদ্রের দশকোটি পরিমাণের সমান হতে পারে। এই ফলাফলটি ভূতাত্ত্বিক ও পদার্থবিজ্ঞানী দল একত্রে পরিচালিত গবেষণার ভিত্তিতে পাওয়া গেছে।
গবেষকরা উচ্চচাপের পরীক্ষার জন্য ডায়মন্ড অ্যানভিল সেল ব্যবহার করে গহ্বরের কেন্দ্রে থাকা চরম চাপ ও তাপমাত্রা পুনরায় সৃষ্টি করেছেন। প্রায় ৩৬০ গিগাপাস্কাল চাপ ও ৪,৫০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা পর্যন্ত পৌঁছে, তারা লোহা ও হাইড্রোজেনের পারস্পরিক ক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করেছেন।
পরীক্ষা থেকে দেখা গেছে লোহা উচ্চচাপে হাইড্রোজেনকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে শোষণ করতে পারে। শোষণের হার প্রায় ১-২ ওজন শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছায়, যা গহ্বরের কেন্দ্রীয় অংশের মোট ভরকে উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস করে। এই তথ্যকে ভিত্তি করে বিজ্ঞানীরা গহ্বরের হাইড্রোজেনের মোট পরিমাণের অনুমান করেছেন।
গণনা অনুযায়ী, যদি গহ্বরের কেন্দ্রীয় অংশে হাইড্রোজেনের শোষণ সর্বোচ্চ স্তরে থাকে, তবে তা সমুদ্রের প্রায় ১০ থেকে ৩০ গুণের সমান পরিমাণ হতে পারে। কিছু অনুমান আরও বেশি করে ৫০ গুণের কাছাকাছি পৌঁছাতে পারে, তবে তা নির্ভর করে শোষণের সুনির্দিষ্ট শর্তের উপর।
হাইড্রোজেনের উপস্থিতি গহ্বরের ঘনত্ব ও সিসমিক তরঙ্গের গতি ব্যাখ্যা করতে সাহায্য করে। পূর্বে পর্যবেক্ষিত কিছু সিসমিক অস্বাভাবিকতা হাইড্রোজেনের হালকা স্বভাবের কারণে হতে পারে, যা গহ্বরের সামগ্রিক ভরকে কমিয়ে দেয়। এই দৃষ্টিকোণ থেকে গহ্বরের গঠন সম্পর্কে নতুন ধারণা উদ্ভূত হয়েছে।
ম্যাগনেটিক ফিল্ডের উৎপাদনে গহ্বরের তরল অংশের কনভেকশন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। হাইড্রোজেনের উপস্থিতি তরলের ঘনত্ব ও ভিস্কোসিটিকে প্রভাবিত করে, ফলে কনভেকশন প্যাটার্নে পরিবর্তন আসতে পারে। এই পরিবর্তন পৃথিবীর চৌম্বকীয় ক্ষেত্রের শক্তি ও স্থিতিশীলতায় প্রভাব ফেলতে পারে।
তাপ স্থানান্তরেও হাইড্রোজেনের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। হাইড্রোজেনের উচ্চ দ্রবণীয়তা গহ্বরের তাপ প্রবাহকে দ্রুততর করতে পারে, যা গহ্বরের শীতলন প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করে। ফলে পৃথিবীর অভ্যন্তরীণ তাপমাত্রা ও ভূগর্ভস্থ গতিবিদ্যায় নতুন দৃষ্টিকোণ যোগ হয়।
পূর্বে গহ্বরের হালকা উপাদান হিসেবে সলফার, অক্সিজেন ও সিলিকনকে প্রধানত ধরা হয়। হাইড্রোজেনের সম্ভাব্য বৃহৎ পরিমাণ এই প্রচলিত মডেলকে পুনর্বিবেচনা করতে বাধ্য করে। নতুন মডেলগুলো হাইড্রোজেনকে অন্যতম প্রধান হালকা উপাদান হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করে।
এই আবিষ্কারটি গ্রহের গঠন ও বিকাশের তত্ত্বেও প্রভাব ফেলতে পারে। প্রাথমিক পর্যায়ে পৃথিবী গ্যাসীয় অবস্থায় থাকাকালীন হাইড্রোজেনকে ধরা বা আটকে রাখা সম্ভব হয়েছিল, যা আজকের গহ্বরের কেন্দ্রে তার উপস্থিতি ব্যাখ্যা করতে পারে।
তবে গবেষকরা উল্লেখ করেন যে হাইড্রোজেনের সঠিক পরিমাণ এখনও অনিশ্চিত। পরীক্ষার শর্ত, গহ্বরের প্রকৃত তাপমাত্রা ও চাপের পার্থক্য, এবং হাইড্রোজেনের দীর্ঘমেয়াদী স্থায়িত্ব সম্পর্কে আরও তথ্য প্রয়োজন। ভবিষ্যতে আরও সূক্ষ্ম পরীক্ষার মাধ্যমে এই অনিশ্চয়তা কমানো সম্ভব হবে।
বৈজ্ঞানিক সম্প্রদায় এখন এই ফলাফলকে ভিত্তি করে অতিরিক্ত গবেষণা চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানাচ্ছে। উচ্চচাপের ল্যাবরেটরি পরীক্ষা, সিসমিক ডেটার বিশ্লেষণ এবং কম্পিউটেশনাল মডেল একত্রে গহ্বরের হাইড্রোজেনের প্রকৃতি স্পষ্ট করতে সহায়তা করবে।
পাঠকরা যদি এই বিষয়ে আরও জানার ইচ্ছা রাখেন, তবে বিজ্ঞান জার্নাল ও বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকাশিত গবেষণাপত্রে আপডেটেড তথ্য অনুসরণ করা উপকারী হবে। পৃথিবীর গহ্বরের গঠন সম্পর্কে নতুন দৃষ্টিকোণ আমাদের ভবিষ্যৎ গবেষণার পথকে সমৃদ্ধ করবে।



