অন্তর্বর্তী সরকারের নজরদারি প্রযুক্তি পর্যালোচনা কমিটি বুধবার (১১ ফেব্রুয়ারি) প্রধান উপদেষ্টার কাছে চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। প্রতিবেদনে গোপনীয়তা রক্ষা, নিরাপত্তা নিশ্চিত এবং নাগরিকের সংবিধানিক অধিকার রক্ষার জন্য আটটি মূল সুপারিশ অন্তর্ভুক্ত। এই পদক্ষেপের লক্ষ্য আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারে স্বচ্ছতা ও দায়বদ্ধতা বৃদ্ধি করা।
কমিটির সদস্যরা উল্লেখ করেছেন যে, বর্তমান নজরদারি কাঠামো স্বচ্ছতার অভাবে জনসাধারণের বিশ্বাস ক্ষুণ্ন করেছে। তাই তারা আন্তর্জাতিক টেলিযোগাযোগ ইউনিয়নের (ITU) নির্দেশনা অনুসারে ‘দ্বিস্তরীয় স্বচ্ছতা ও গোপনীয়তা’ মডেল প্রস্তাব করেছে। এই মডেলটি দুই স্তরে তথ্যের প্রবেশ ও ব্যবহারের নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করে, যাতে নিরাপত্তা সংস্থা এবং নাগরিকের অধিকার একসঙ্গে সুরক্ষিত থাকে।
প্রতিবেদনটি অতীতের গুম ও বেআইনি আটকের মতো মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনাকে পটভূমি হিসেবে তুলে ধরে। এসব ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে কমিটি সংস্কারকে জরুরি বলে বিবেচনা করেছে, যাতে ভবিষ্যতে অনধিকারিক নজরদারি রোধ করা যায়।
প্রস্তাবিত সুপারিশের মধ্যে অন্যতম হল ন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন মনিটরিং সেন্টার (এনটিএমসি) বিলুপ্তি। কমিটি যুক্তি দিয়েছে যে, কেন্দ্রীয় পর্যবেক্ষণ সংস্থা ছাড়া স্বতন্ত্র তদারকি ব্যবস্থা গঠন করলে তথ্যের অপব্যবহার কমবে এবং স্বচ্ছতা বাড়বে।
এছাড়া ২০০১ সালের টেলিযোগাযোগ আইন, বিশেষ করে ৯৭ নম্বর ধারাসহ সংশ্লিষ্ট উপধারাগুলোর সংস্কারের জন্য বিশদ রোডম্যাপ উপস্থাপন করা হয়েছে। এই রোডম্যাপের ভিত্তিতে ইতিমধ্যে অন্তর্বর্তী সরকার সংশোধিত সংস্করণ গেজেটভুক্ত করেছে, যা আইনগত কাঠামোকে আধুনিক চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করবে।
কমিটি জোর দিয়ে বলেছে যে, রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ও নাগরিকের অধিকার পরস্পর বিরোধী নয়, বরং পরস্পরকে সম্পূরক। নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গোপনীয়তা রক্ষা করা এবং একইসাথে নাগরিকের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা বজায় রাখা সম্ভব, যদি নীতি-নির্ধারণে উভয় দিককে সমান গুরুত্ব দেওয়া হয়।
প্রতিবেদনটি স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার জন্য নিয়মিত অডিট ও নিরীক্ষা ব্যবস্থা প্রস্তাব করেছে। এই ব্যবস্থা অনুযায়ী, ত্রৈমাসিক ভিত্তিতে স্বাধীন তদারকি সংস্থা রিপোর্ট প্রস্তুত করবে এবং তা সরকার ও জনসাধারণের সামনে প্রকাশ করবে।
কমিটির কিছু সদস্যের মতে, এই সংস্কারগুলো সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হলে সন্ত্রাসবিরোধী কার্যক্রমে রাষ্ট্রের সাফল্য বৃদ্ধি পাবে, পাশাপাশি মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঝুঁকি কমবে। তবে কিছু নিরাপত্তা বিশ্লেষক উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন যে, অতিরিক্ত স্বচ্ছতা কিছু গুরুত্বপূর্ণ গোয়েন্দা তথ্যের প্রবেশ সীমিত করতে পারে।
বিপরীত দৃষ্টিকোণ থেকে কিছু নাগরিক অধিকার সংস্থা উল্লেখ করেছে যে, এনটিএমসি বিলুপ্তি এবং নতুন অডিট ব্যবস্থা যথাযথভাবে কার্যকর না হলে নজরদারি ক্ষমতা ছড়িয়ে পড়তে পারে। তারা দাবি করেছে যে, নতুন কাঠামোতে স্পষ্ট শাসন ও দায়িত্ববণ্টন নিশ্চিত করা জরুরি।
অন্তর্বর্তী সরকার এই সুপারিশগুলোকে দ্রুত বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। সরকারী সূত্র অনুযায়ী, সংশোধিত টেলিযোগাযোগ আইন ইতিমধ্যে গেজেটভুক্ত হওয়ায় আইনগত ভিত্তি তৈরি হয়েছে এবং পরবর্তী ধাপে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর কাঠামোগত পরিবর্তন শুরু হবে।
কমিটির চূড়ান্ত প্রতিবেদন সরকারকে হস্তান্তরের পর, প্রধান উপদেষ্টা তা পর্যালোচনা করে পরবর্তী পদক্ষেপ নির্ধারণের জন্য একটি উচ্চ পর্যায়ের সভা আহ্বান করবেন বলে জানানো হয়েছে। এই সভায় নিরাপত্তা সংস্থা, মানবাধিকার সংস্থা এবং আইনি বিশেষজ্ঞদের অংশগ্রহণের সম্ভাবনা রয়েছে।
সারসংক্ষেপে, অন্তর্বর্তী সরকারের নজরদারি প্রযুক্তি পর্যালোচনা কমিটি গোপনীয়তা রক্ষা, স্বচ্ছতা বৃদ্ধি এবং আইনি কাঠামো আধুনিকায়নের জন্য বিস্তৃত সুপারিশ উপস্থাপন করেছে। এই সুপারিশগুলো বাস্তবায়িত হলে দেশের নিরাপত্তা ও নাগরিক অধিকার উভয়েরই উন্নতি আশা করা যায়।



