ওয়াশিংটন, ১১ ফেব্রুয়ারি – যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসে অনুষ্ঠিত এক বিশেষ ব্রিফিংয়ে বাংলাদেশে ১২ ফেব্রুয়ারি নির্ধারিত জাতীয় নির্বাচনের বৈধতা নিয়ে তীব্র আলোচনা হয়। ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর বাড়তে থাকা সহিংসতা এবং নির্বাচনী প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা অংশগ্রহণকারীরা, দেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎকে প্রশ্নবিদ্ধ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।
ব্রিফিংটি “বাংলাদেশে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে সহিংসতা” শিরোনামে হিন্দু অ্যাকশন ও নর্থ আমেরিকান কোয়ালিশন অব হিন্দুজের সমন্বয়ে আয়োজিত হয়। উভয় সংস্থা ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের সুরক্ষার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে, বাংলাদেশে সাম্প্রতিক হিংসা ও নির্বাচনী পরিবেশের অবনতির দিকে ইঙ্গিত করে।
আমেরিকান এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ গবেষক মাইকেল রুবিন, ব্রিফিংয়ে জামায়াত-এ-ইসলামিকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে চিহ্নিত করার পক্ষে মত প্রকাশ করেন এবং তার নিষেধাজ্ঞা দাবি করেন। রুবিনের মতে, সংগঠনটি ধর্মীয় রূপকথা ব্যবহার করে অপরাধ ও দুর্নীতির দায় থেকে নিজেকে রক্ষা করার চেষ্টা করে, যা বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদী স্থিতিশীলতার জন্য ক্ষতিকর।
রুবিন একই সঙ্গে নোবেল বিজয়ী মুহাম্মদ ইউনূসকে গণতন্ত্র ও মানবতার বিরোধী হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, ইউনূসের কর্মকাণ্ড দেশের গণতান্ত্রিক কাঠামোর ওপর আক্রমণাত্মক প্রভাব ফেলছে এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নৈতিক মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্যহীন।
ব্রিফিংয়ে রুবিন ১২ ফেব্রুয়ারি নির্ধারিত নির্বাচনের কোনো বৈধতা থাকবে না, এমন মন্তব্য করেন। তিনি যুক্তি দেন, যদি নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় একতরফা বাদ দেওয়া দলগুলোকে অন্তর্ভুক্ত না করা হয়, তবে ফলাফল আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পাবে না।
রুবিনের একটি উক্তিতে তিনি বলেন, “ধর্মের দোহাই দিয়ে জামায়াত-এ-ইসলামি অপরাধকে ঢাকতে চায়, যা কোনো সময়ে বাংলাদেশের মঙ্গলে পরিণত হবে না।” এই বক্তব্যে তিনি সংগঠনের ধর্মীয় রূপকথা ব্যবহারকে সমালোচনা করে, তার নীতি-নির্ধারণে স্বচ্ছতার অভাবকে তুলে ধরেছেন।
ওয়াশিংটন পোস্টের একটি প্রতিবেদনের উল্লেখ করে রুবিন যুক্তি দেন, ট্রাম্প প্রশাসন জামায়াত-এ-ইসলামির সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলছে, যা কোনোভাবে গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। তিনি জোর দিয়ে বলেন, সন্ত্রাসে লিপ্ত, গণতন্ত্রের প্রতি অবহেলাপূর্ণ এবং নারীর স্বাধীনতাকে হরণকারী সংগঠনের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক থাকা উচিত নয়।
রুবিনের মতে, রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাট উভয়ই একসঙ্গে কাজ করে ১৯৭১ সালের পরাজয়ের প্রতিশোধ নিতে চাওয়া জামায়াত-এ-ইসলামির সহযোগীকে থামাতে হবে। তিনি অতীতের ঐতিহাসিক দায়িত্বকে বর্তমান রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জের সঙ্গে যুক্ত করে, দ্বিপাক্ষিক সমন্বয়ের আহ্বান জানান।
মিশিগান থেকে আসা রিপাবলিকান কংগ্রেসম্যান টম ব্যারেট, ইসলামিক চরমপন্থা দেশীয় অস্থিরতা সৃষ্টির দিকে ইঙ্গিত করে, যুক্তরাষ্ট্রের মানবতা রক্ষার প্রস্তুতি উল্লেখ করেন। ব্যারেট বলেন, যুক্তরাষ্ট্র সবসময় দক্ষিণ এশিয়ার শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ, এবং ধর্মীয় ভিত্তিতে কোনো সহিংসতা বা হত্যাকাণ্ডকে সমর্থন করে না।
ভার্জিনিয়া থেকে ডেমোক্র্যাট কংগ্রেসম্যান সুহাস সুব্রমনিয়ম, হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর বাড়তে থাকা সহিংসতা অগ্রহণযোগ্য বলে উল্লেখ করেন। তিনি একই সঙ্গে আওয়ামী লীগকে বাদ দিয়ে নির্বাচনের পরিকল্পনা সমালোচনা করে, এমন প্রক্রিয়াকে প্রশ্নবিদ্ধ হিসেবে চিহ্নিত করেন। সুব্রমনিয়মের মতে, দেশের রাজনৈতিক সমতা না থাকলে নির্বাচন বৈধতা হারাবে।
সুব্রমনিয়ম আরও জোর দিয়ে বলেন, এখন সময় বক্তব্যের নয়, কাজের। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের সরকারকে বাংলাদেশে মানবাধিকার রক্ষার জন্য সক্রিয় পদক্ষেপ নিতে আহ্বান জানান, যাতে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের সুরক্ষা নিশ্চিত হয় এবং স্বচ্ছ নির্বাচন নিশ্চিত হয়।
ব্রিফিংয়ের আলোচনায় স্পষ্ট হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক দলগুলো বাংলাদেশে ধর্মীয় সহিংসতা ও নির্বাচনী অবিচারের বিষয়ে সমন্বিত অবস্থান গ্রহণ করছে। এই সমন্বয় ভবিষ্যতে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে, বিশেষ করে উন্নয়ন সহায়তা, বাণিজ্যিক চুক্তি এবং নিরাপত্তা সহযোগিতার ক্ষেত্রে।
বিশেষজ্ঞরা অনুমান করছেন, যদি বাংলাদেশ সরকার আন্তর্জাতিক সমালোচনার প্রতি সাড়া না দেয়, তবে যুক্তরাষ্ট্রের দৃষ্টিভঙ্গি কঠোর হতে পারে। এর ফলে বিদেশি বিনিয়োগের প্রবাহ, উন্নয়ন প্রকল্পের তহবিল এবং কূটনৈতিক সমর্থন হ্রাস পেতে পারে, যা দেশের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলবে।
সারসংক্ষেপে, ওয়াশিংটনে অনুষ্ঠিত কংগ্রেসনাল ব্রিফিং বাংলাদেশে চলমান রাজনৈতিক উত্তেজনা ও ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা সমস্যাকে আন্তর্জাতিক মঞ্চে তুলে ধরেছে। নির্বাচনের বৈধতা, জামায়াত-এ-ইসলামির ভূমিকা এবং ধর্মীয় সহিংসতার মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্রের স্পষ্ট অবস্থান ভবিষ্যতে দেশের অভ্যন্তরীণ ও বহিরাগত নীতিতে প্রভাব ফেলবে।



