শ্রীলঙ্কার গামপাহা হাইকোর্ট বুধবার, ১১ ফেব্রুয়ারি, ২০২২ সালের গণ-অভ্যুত্থানের সময় এক সংসদ সদস্যকে পিটিয়ে হত্যা করা ১২ জন অভিযুক্তকে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করেছে। রায়টি তিন বিচারকের বেঞ্চে সংখ্যাগরিষ্ঠ মতের ভিত্তিতে শোনানো হয় এবং সংশ্লিষ্ট মামলায় আরও ২৩ জনকে মুক্তি দেওয়া হয়েছে।
মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তদের অপরাধের মূল ঘটনা ২০২২ সালের মে মাসে নিত্তাম্বুয়া শহরে ঘটেছিল, যা কলম্বো রাজধানীর নিকটবর্তী। ৫৭ বছর বয়সী আইনপ্রণেতা অমরকীর্তি আথুকোরালা তার গাড়ি দিয়ে প্রতিবাদরত জনতার গতি বাধা দেন এবং গুলিবর্ষণ করেন। গুলির প্রতিক্রিয়ায় জনতা তাকে ঘিরে নেয়, কয়েক হাজার মানুষের ভিড়ের মধ্যে তাকে বহুবার পিটিয়ে হত্যা করে; তার দেহরক্ষীও একই সময়ে নিহত হয়।
অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে তদন্তকারী কর্মকর্তারা আদালতে জানিয়েছেন যে, আথুকোরালার গাড়ি আটকে দেওয়ার পর তিনি সরাসরি শুটিং চালিয়ে জনতার মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করেন। শুটিংয়ের পর তিনি আশ্রয়ের জন্য একটি ভবনে প্রবেশের চেষ্টা করেন, তবে সেখানেও জনতার চাপা হয়ে তাকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। এই ঘটনাটি দেশের তীব্র খাদ্য, জ্বালানি ও ওষুধের সংকটের মধ্যে বিক্ষোভের শীর্ষে ঘটেছিল।
২০২২ সালের মে মাসে শ্রীলঙ্কা ব্যাপক অর্থনৈতিক সংকটে ডুবে ছিল; বৈদেশিক মুদ্রার অভাবে দেশীয় আমদানি ব্যয় মেটাতে পারছিল না। ফলস্বরূপ, খাবার, জ্বালানি ও ওষুধের ঘাটতি নিয়ে দেশজুড়ে প্রতিবাদ শুরু হয়। এই সময়ে সরকারী দলের সমর্থকরা কলম্বোতে শান্তিপূর্ণ সমাবেশকে সহিংসভাবে দমন করে, ফলে সরকারী দলের অন্তত ৭৫ জন আইনপ্রণেতার বাড়ি জ্বালিয়ে দেয়া হয়।
গামপাহা হাইকোর্টের তিনজন বিচারক ১২ জনকে দোষী সাব্যস্ত করে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দেন এবং অন্য ২৩ জনকে খালাস প্রদান করেন। রায়ের বিরুদ্ধে অভিযুক্তরা সুপ্রিম কোর্টে আপিল করার অধিকার রাখে। শ্রীলঙ্কায় ১৯৭৬ সালের পর থেকে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়নি, তবে গুরুতর অপরাধে আদালত এখনও ফাঁসির আদেশ দেয়।
অভ্যুত্থানের সময় তৎকালীন প্রেসিডেন্ট গোতাবায়া রাজাপাকসের সমর্থকরা শাসনকালের নীতি বিরোধী প্রতিবাদকে দমন করার চেষ্টা করে, যার ফলে রাজনৈতিক অস্থিরতা বাড়ে। শেষ পর্যন্ত গোতাবায়া রাজাপাকস এবং তার ভাই, তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মাহিন্দা রাজাপাকস পদত্যাগ করেন। এই রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর দেশীয় ঋণ সমস্যার সমাধানে নতুন পদক্ষেপ নেওয়া হয়।
এপ্রিল ২০২২-এ শ্রীলঙ্কা ৪৬ বিলিয়ন ডলার বৈদেশিক ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হওয়ায় ব্যাপক প্রতিবাদ শুরু হয়। পরবর্তীতে রনিল বিক্রমাসিংহে, যিনি রাজাপাকসের উত্তরসূরি, ২০২৩ সালের শুরুর দিকে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) কাছ থেকে বিশাল পরিমাণ ঋণ গ্রহণ করেন। এই ঋণ দেশের আর্থিক সংকট সামাল দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
সেপ্টেম্বর ২০২৪-এ অনুষ্ঠিত প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে রনিল বিক্রমাসিংহে বামপন্থী অনুরা কুমারা দিশানায়েকের কাছে পরাজিত হন। দিশানায়েক ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকে ব্যয় কমানোর নীতি অনুসরণ করে দেশের অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করার চেষ্টা করছেন।
আদালতের রায়ের পরবর্তী পর্যায়ে অভিযুক্তদের সুপ্রিম কোর্টে আপিলের সম্ভাবনা রয়েছে, যা শ্রীলঙ্কার আইনি ব্যবস্থার ওপর নতুন আলো ফেলবে। একই সঙ্গে, মৃত্যুদণ্ডের কার্যকর না হওয়া সত্ত্বেও এই রায় দেশের মানবাধিকার সংস্থার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে।
শ্রীলঙ্কার বিচারিক প্রক্রিয়া এবং রাজনৈতিক পরিবর্তনের পটভূমিতে এই রায় দেশের আইনি ন্যায়বিচার ও মানবাধিকার নীতির বাস্তবায়নকে কীভাবে প্রভাবিত করবে, তা সময়ের সাথে স্পষ্ট হবে।



