বুর্কিনা ফাসোর কেন্দ্রীয় অঞ্চলে ২০২২ সালে জিহাদি গোষ্ঠীর আক্রমণে চারজন পুত্রের প্রাণ নেওয়া ৫৭ বছর বয়সী যামেওগো আমিনাতার (Yameogo Aminata) কষ্টকর গল্প শরণার্থী ক্যাম্পে পুনরাবৃত্তি হচ্ছে। আইভরি কোস্টের নিয়োরোনিগুয়ে শিবিরে বসে তিনি সেই রক্তাক্ত সন্ধ্যার স্মৃতি থেকে মুক্তি পেতে পারছেন না।
আক্রমণটি ঘটে যখন আমিনাতা তার বাড়ি থেকে দূরে ছিলেন। একই বছর জিহাদি সশস্ত্র দলটি তার গ্রাম দখল করে গবাদি পশু ও জমি জব্দ করে এবং বহু বাসিন্দাকে হত্যা করে। তার পুত্রদের বয়স ২৫ থেকে ৩২ বছর, এবং তারা গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যায়। শিবিরে তার বর্ণনা অনুযায়ী, “তারা আমার চারটি সন্তানকে গলা কেটে ফেলেছে” এবং “আমি যখন পৌঁছালাম, তারা আমার চতুর্থ পুত্রকে হত্যা করছিল”।
আক্রমণের সময় আমিনাতা নিজে একটি ছুরি নিয়ে প্রতিরোধের চেষ্টা করেন, তবে শত্রুরা তাকে অতিক্রম করে মাথা, কাঁধ ও গলায় গুরুতর আঘাত হানে। তিনি গাছের ঝোপে ফেলে দেওয়া হয় এবং তার মেয়ে আক্রমণের সময় বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, যা এখনও অজানা।
২০২৩ সালে তিনি আইভরি কোস্টের নিয়োরোনিগুয়ে শিবিরে আশ্রয় নেন, যেখানে তিনি সেই দিনটির রক্তমাখা পোশাক সংরক্ষণ করে রাখেন। শিবিরে বসে তিনি জানান, “আমি জানি না কীভাবে জীবনের সঙ্গে সামলাব, আমার কিছুই নেই”।
বুর্কিনা ফাসো, মালি ও নাইজারের সীমান্তে চলমান বিদ্রোহে অন্তত ১০,০০০ জনের বেশি প্রাণ হারিয়েছে। জাতিসংঘ এই অঞ্চলকে “বিশ্বব্যাপী জিহাদি সহিংসতার কেন্দ্রবিন্দু” বলে উল্লেখ করেছে। তিনটি দেশের সামরিক জুন্তা শাসন গ্রহণের পর নিরাপত্তা পরিস্থিতি উন্নত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, তবে তারা ঐতিহ্যবাহী পশ্চিমা মিত্রদের থেকে দূরে সরে রাশিয়ার সামরিক সহায়তা গ্রহণ করেছে।
রাশিয়ার আফ্রিকা কর্পসের সৈন্যবাহিনী বুর্কিনায় মোতায়েন হলেও বিদ্রোহের তীব্রতা কমেনি। সবচেয়ে শক্তিশালী জিহাদি গোষ্ঠী হল আল-কায়েদা-সংযুক্ত জমা’আত নুসরাত আল-ইসলাম ওয়াল-মুসলিমিন (JNIM), যা বুর্কিনা ফাসোর উত্তরে ব্যাপক কার্যক্রম চালাচ্ছে।
আমিনাতার মতোই, ৬০ বছর বয়সী কৃষক হাসান তাল (Hassane Tall) ২০২৩ সালে তার তিনজন স্ত্রী ও ১৯ সন্তানসহ উত্তর বুর্কিনার থেকে পালিয়ে আইভরি কোস্টে শরণার্থী ক্যাম্পে পৌঁছেছেন। তিনি বহুবারের আক্রমণের পর নিরাপত্তা বজায় রাখতে না পারার কারণে দেশ ত্যাগ করেন। তালের পরিবারও শিবিরে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মুখোমুখি।
শিবিরে শরণার্থীরা মৌলিক চাহিদা পূরণে সংগ্রাম করছেন; খাবার, স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষার অভাব তাদের দৈনন্দিন জীবনে চাপ বাড়িয়ে দিচ্ছে। আন্তর্জাতিক সংস্থা ও মানবিক সাহায্যকারীরা ত্রাণ সামগ্রী সরবরাহের চেষ্টা করলেও, অব্যাহত নিরাপত্তা হুমকি ও সীমান্তের অস্থিরতা সাহায্যের প্রবাহকে বাধা দিচ্ছে।
বুর্কিনা ফাসোর জিহাদি বিদ্রোহের মূল কারণগুলোতে দারিদ্র্য, শাসনব্যবস্থার দুর্বলতা ও ধর্মীয় চরমপন্থা অন্তর্ভুক্ত। জোটবদ্ধ সামরিক শাসন ও রাশিয়ার সামরিক সমর্থন দীর্ঘমেয়াদে সংঘাতের সমাধান করতে পারবে কিনা তা এখনো অনিশ্চিত। তবে বর্তমান পরিস্থিতি শরণার্থীদের জন্য নিরাপদ আশ্রয় ও পুনর্বাসনের প্রয়োজনীয়তা তীব্রভাবে প্রকাশ করে।
আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা জোর দিয়ে বলছেন যে, বুর্কিনা ফাসো, মালি ও নাইজারের জিহাদি হুমকি মোকাবিলায় সমন্বিত কূটনৈতিক ও মানবিক পদক্ষেপ অপরিহার্য। তৎক্ষণাত নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, শরণার্থীদের মৌলিক অধিকার রক্ষা এবং দীর্ঘমেয়াদী পুনর্গঠন পরিকল্পনা ছাড়া এই অঞ্চলের স্থিতিশীলতা অর্জন করা কঠিন হবে।



