স্বাস্থ্য খাতের দীর্ঘস্থায়ী সংকটের প্রেক্ষিতে সরকার ও রাজনৈতিক দলগুলো নতুন নীতিমালা নিয়ে আলোচনা করছে। স্বাস্থ্য সংস্কার কমিশনের সাম্প্রতিক প্রস্তাব এবং বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর নির্বাচনী ইশতেহার দুটোই স্বাস্থ্যকে মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার দিকে ইঙ্গিত করে। এই প্রস্তাবগুলো আসন্ন নির্বাচনের আগে প্রকাশিত হয়েছে, ফলে ভোটারদের মনোভাব গঠনে প্রভাব ফেলতে পারে।
বছরের পর বছর ধরে দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা অবকাঠামো ও কর্মী ঘাটতির কারণে ব্যাহত হয়েছে। হাসপাতাল ও ক্লিনিকের পুরনো সরঞ্জাম, ডাক্তার-নার্সের অপর্যাপ্ত সংখ্যা এবং চিকিৎসা ব্যয়ের বাড়তি চাপ রোগীদের অসন্তোষ বাড়িয়ে তুলেছে। জনসাধারণের অভিযোগে দেখা যায় যে, সেবার মানের অবনতি এবং প্রয়োজনীয় ওষুধের ঘাটতি স্বাস্থ্যকে রাষ্ট্রের দুর্বলতা হিসেবে চিহ্নিত করছে।
এই পরিস্থিতি শুধুমাত্র স্বাস্থ্য খাতের নয়, সমগ্র রাষ্ট্র পরিচালনার সক্ষমতার সূচক হিসেবে বিবেচিত হয়। যখন মৌলিক সেবা প্রদান করতে ব্যর্থ হয়, তখন নাগরিকদের সরকারের প্রতি আস্থা হ্রাস পায়। তাই স্বাস্থ্য সংস্কারকে অগ্রাধিকার দেওয়া মানে রাষ্ট্রের কার্যকারিতা বাড়ানো।
স্বাস্থ্য সংস্কার কমিশন সম্প্রতি একটি বিস্তৃত প্রস্তাবনা উপস্থাপন করেছে। এতে স্বাস্থ্যকে মৌলিক অধিকার ঘোষণা, ইউনিভার্সাল হেলথ কভারেজ নিশ্চিত করা এবং জাতীয় স্বাস্থ্য বীমা চালু করার পরিকল্পনা অন্তর্ভুক্ত। এছাড়া প্রাথমিক থেকে তৃতীয় স্তরের হাসপাতাল ব্যবস্থার আধুনিকায়ন, জরুরি ওষুধের সুনিশ্চিত সরবরাহ এবং ডিজিটাল স্বাস্থ্য কার্ড ও রেফারেল সিস্টেমের প্রবর্তনও উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রস্তাবের মূল দিকগুলোতে স্বাস্থ্যকে সর্বজনীন সেবা হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্য স্পষ্ট। ইউনিভার্সাল হেলথ কভারেজের মাধ্যমে প্রতিটি নাগরিকের মৌলিক চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করা হবে, আর জাতীয় স্বাস্থ্য বীমা রোগীর আর্থিক বোঝা কমাবে। এই নীতিগুলো স্বাস্থ্য সেবার সমতা ও প্রবেশযোগ্যতা বাড়াবে বলে আশা করা হচ্ছে।
হাসপাতাল স্তরের উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রাথমিক স্বাস্থ্য কেন্দ্র থেকে তৃতীয় স্তরের বিশেষায়িত হাসপাতাল পর্যন্ত সেবা শৃঙ্খলা মজবুত করবে। প্রয়োজনীয় ওষুধের সরবরাহ নিশ্চিত করতে সরবরাহ শৃঙ্খলা পুনর্গঠন এবং ডিজিটাল স্বাস্থ্য কার্ডের মাধ্যমে রোগীর তথ্য একত্রিত করে রেফারেল সিস্টেম চালু করা হবে। এই ব্যবস্থা রোগীর চিকিৎসা ইতিহাস দ্রুত অ্যাক্সেসের সুযোগ দেবে।
বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারে একই ধরনের ধারনা প্রকাশ পেয়েছে। দলটি স্বাস্থ্যকে মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি, ইউনিভার্সাল হেলথ কভারেজ, জাতীয় স্বাস্থ্য বীমা, হাসপাতাল উন্নয়ন, ওষুধের প্রাপ্যতা এবং ডিজিটাল স্বাস্থ্য কার্ডের কথা উল্লেখ করেছে। ফলে দেখা যায়, কমিশনের প্রস্তাবের সঙ্গে দলটির ইশতেহার বেশ সমন্বিত।
এটি নির্দেশ করে যে, বিএনপি স্বাস্থ্য খাতকে সংগঠিত রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার মাধ্যমে উন্নত করার প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করেছে। প্রস্তাবের কাঠামোগত দিকনির্দেশনা গ্রহণ করে দলটি নীতি বাস্তবায়নের বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়াতে চায়।
এককভাবে ভোটের ফল নির্ধারণ করে না; রাজনৈতিক বিশ্বাস, নেতৃত্বের গ্রহণযোগ্যতা, অতীতের অভিজ্ঞতা এবং নির্বাচনী পরিবেশ সবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তবে স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও কর্মসংস্থান মতো মৌলিক বিষয়গুলো ভোটারদের মনোভাব গঠনে বিশেষ প্রভাব ফেলে, বিশেষ করে নগর মধ্যবিত্ত এবং তরুণ ভোটারদের মধ্যে।
শহরাঞ্চলে মধ্যবিত্ত পরিবার এবং তরুণ প্রজন্মের জন্য স্বাস্থ্য সেবা, সাশ্রয়ী চিকিৎসা এবং সেবার মানের উন্নতি ভোটের সিদ্ধান্তে গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর হয়ে দাঁড়ায়। এই গোষ্ঠী প্রায়শই নীতি বাস্তবায়নের বাস্তবিক দিককে বেশি গুরুত্ব দেয়, ফলে স্বাস্থ্য সংক্রান্ত প্রতিশ্রুতি তাদের ভোটের পছন্দে প্রভাব ফেলতে পারে।
কমিশনের প্রস্তাব রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য একটি সুযোগ তৈরি করে। যারা এই নীতিগুলোকে নিজেদের ইশতেহারে যুক্ত করতে পারবে এবং বাস্তবায়নের সক্ষমতা প্রদর্শন করবে, তারা নীতিগত উচ্চতা ছাড়াও নাগরিকের আস্থা অর্জন করতে পারবে। ফলে স্বাস্থ্য সংস্কার কেবল শব্দচয়ন নয়, বাস্তবিক ফলাফল হিসেবে বিবেচিত হবে।
সারসংক্ষেপে, স্বাস্থ্য খাতের সংস্কার নাগরিকের জীবন, মর্যাদা ও ন্যায়বিচারের প্রশ্ন। যদি রাজনৈতিক আলোচনায় স্বাস্থ্যকে সত্যিকারের অগ্রাধিকার দেওয়া হয়, তবে তা ভোটের সংখ্যার বাইরে দেশের ভবিষ্যৎ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। স্বাস্থ্য নীতির বাস্তবায়ন কীভাবে নিশ্চিত করা হবে, তা নিয়ে আরও বিশদ আলোচনা এবং পর্যবেক্ষণ প্রয়োজন।



