১১ ফেব্রুয়ারি বুধবার, আন্তর্জাতিক ফেডারেশন অব জার্নালিস্টস (আইএফজে), ফেডারেশন অব এশিয়া‑প্যাসিফিক জার্নালিস্টস (এফএপিএজে) এবং সাউথ এশিয়া জার্নালিস্টস ফেডারেশন (এসএজেএফ) একত্রে যৌথ বিবৃতি প্রকাশ করে। বিবৃতিতে বলা হয়েছে, নির্বাচনের পূর্বে সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে গণতন্ত্রের পুনরুদ্ধার অসম্ভব। তিনটি সংস্থা দেশের মিডিয়ার স্বাধীনতা রক্ষার জন্য অবিলম্বে পদক্ষেপের দাবি জানায়।
শেখ হাসিনার ১৭ বছর দীর্ঘ শাসনের সমাপ্তি এবং জুলাই ২০২৪-এ ঘটে যাওয়া গণ‑অভ্যুত্থানের পর, ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারও মিডিয়ার ওপর দমন‑পীড়ন কমাতে ব্যর্থ হয়েছে। এই সময়কালে সাংবাদিকদের ওপর হুমকি, আক্রমণ এবং আইনি চাপের মাত্রা বাড়তে থাকে, যা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা ক্ষুণ্ণ করে।
মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশন (এমএসএফ) অনুসারে, হাশিনা সরকারের পতনের পর থেকে ৮০০‑এর বেশি মিডিয়া কর্মী শারীরিক বা মানসিক আক্রমণের শিকার হয়েছে। এদের মধ্যে ৪৬৫টি ঘটনা সরাসরি হুমকি বা আঘাতের সঙ্গে যুক্ত, আর অন্তত ৪৩০টি মামলা সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে দায়ের করা হয়েছে। এসব তথ্য দেশের মিডিয়া পরিবেশের অবনতি স্পষ্টভাবে তুলে ধরে।
সাম্প্রতিক সময়ে দ্য ডেইলি স্টার এবং প্রথম আলোর সদর দফতরে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। দুইটি প্রধান সংবাদমাধ্যমের অফিসে আক্রমণ মিডিয়ার স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা সম্পর্কে উদ্বেগ বাড়িয়ে দিয়েছে। একই সঙ্গে নরসিংদিতে ক্রাইম রিপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের দশজন সদস্যের ওপর সহিংস হামলা হয়েছে, যা সাংবাদিকদের কাজের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তোলার নতুন উদাহরণ।
৩১ জানুয়ারি নির্বাচন কমিশনের সার্ভার থেকে প্রায় ১৪,০০০ সাংবাদিকের ব্যক্তিগত তথ্য ফাঁস হওয়া একটি বড় সাইবার লঙ্ঘন হিসেবে রেকর্ড হয়েছে। তথ্য ফাঁসের ফলে সাংবাদিকদের গোপনীয়তা ও নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়ে। তদুপরি, বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ) সাংবাদিকদের ব্যাংক হিসাব জব্দ ও তদন্তের মাধ্যমে মিডিয়ার ওপর নজরদারি বাড়ানোর চেষ্টা করেছে, যা স্বাধীনতা ও প্রকাশের স্বাধীনতার জন্য হুমকি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
এসএজেএফ উল্লেখ করেছে, হুমকির পরিবেশের ফলে সাংবাদিকদের মধ্যে স্ব-সেন্সরশিপের প্রবণতা বাড়ছে। আত্মনিয়ন্ত্রণের এই সংস্কৃতি সংবাদ সংগ্রহ ও প্রকাশের গুণগত মানকে ক্ষুণ্ণ করে, ফলে জনগণকে সঠিক তথ্য পৌঁছাতে বাধা সৃষ্টি হয়।
সংস্থাগুলি জোর দিয়ে বলেছে, যদি গণমাধ্যমকে রাষ্ট্রের শত্রু হিসেবে দেখা হয় এবং সাংবাদিকদের কারাগারে পাঠানো হয়, তবে কার্যকর গণতন্ত্রের দিকে অগ্রসর হওয়া অসম্ভব। স্বাধীন ও নিরাপদ মিডিয়া ছাড়া নাগরিক সমাজের সচেতনতা ও অংশগ্রহণের ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ে।
এখন সময় এসেছে রাজনৈতিক দলগুলোকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে সাংবাদিকদের নিরাপত্তা ও স্বাধীনতা রক্ষার জন্য সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণের। সংস্থাগুলি সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে আহ্বান জানিয়েছে, হুমকি ও আইনি চাপের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে এবং মিডিয়ার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে।
এই আহ্বান যদি সাড়া পায়, তবে গণতন্ত্রের পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়ায় মিডিয়ার ভূমিকা পুনরায় প্রতিষ্ঠিত হবে এবং দেশের রাজনৈতিক পরিবেশে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত হবে। অন্যথায়, হুমকির ছায়ায় থাকা সাংবাদিকতা গণতান্ত্রিক উন্নয়নের পথে বড় বাধা হয়ে থাকবে।



