বুধবার রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই ল্যাভরভ রাশিয়া-যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক মঞ্চে গ্রিনল্যান্ডে ন্যাটো সেনা পাঠানোর সম্ভাবনা নিয়ে রাশিয়া কঠোর প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। ল্যাভরভ রাশিয়ার আইনপ্রণেতা সমাবেশে উল্লেখ করেন, যদি গ্রিনল্যান্ডকে সামরিকীকরণের মঞ্চ হিসেবে ব্যবহার করা হয় এবং রাশিয়ার বিরোধী সামরিক ক্ষমতা গড়ে তোলা হয়, তবে মস্কো প্রয়োজনীয় সামরিক ও প্রযুক্তিগত পদক্ষেপ গ্রহণ করবে। এই সতর্কতা রাশিয়ার দীর্ঘমেয়াদী আর্কটিক কৌশলগত স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ, যেখানে গ্রিনল্যান্ডকে সম্ভাব্য নিরাপত্তা হুমকি হিসেবে দেখা হয়।
গ্রিনল্যান্ডের ভূ-রাজনৈতিক অবস্থানকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রহের শিকড় ডোনাল্ড ট্রাম্পের সময়ে ফিরে যায়। ট্রাম্প এক সময় গ্রিনল্যান্ডকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অংশ করার ইচ্ছা প্রকাশ করেন, যা আঞ্চলিক উত্তেজনা বাড়িয়ে দেয়। তার পরের বছরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের কিছু উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা গ্রিনল্যান্ডের কৌশলগত গুরুত্বকে পুনরায় জোর দেন, যদিও ট্রাম্পের শেষের দিকে মন্তব্যগুলো কিছুটা নরম হয়।
সাম্প্রতিক সময়ে ডেনমার্ক, নরওয়ে, আইসল্যান্ডসহ কয়েকটি ইউরোপীয় দেশ গ্রিনল্যান্ডে ছোট আকারের সেনা দল পাঠিয়েছে। এই পদক্ষেপগুলো রাশিয়ার উদ্বেগের মূল কারণ হিসেবে উঠে এসেছে, কারণ তারা গ্রিনল্যান্ডকে রাশিয়ার বিরুদ্ধে সামরিক ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করার সম্ভাবনা দেখছে। রাশিয়া এই দেশগুলোকে সতর্ক করে, যে তাদের উপস্থিতি আর্কটিকের সামগ্রিক সামরিক ভারসাম্যকে পরিবর্তন করতে পারে।
ট্রাম্পের শেষের মন্তব্যে তিনি গ্রিনল্যান্ডের যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব বজায় রাখার জন্য ন্যাটো প্রধান মার্ক রুটের সঙ্গে একটি বিশেষ পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছেন বলে জানিয়েছেন। যদিও ট্রাম্পের রায় নরম হয়েছে, তবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক দল এখনও গ্রিনল্যান্ডে তার কৌশলগত অবস্থানকে শক্তিশালী করতে চায়। এই প্রেক্ষাপটে রাশিয়া ডেনমার্ক ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে গ্রিনল্যান্ডের ভূখণ্ডকে রাশিয়ার বিরোধী কাজে ব্যবহার করার অভিযোগ তুলেছে।
ল্যাভরভ ডেনমার্কের বিরুদ্ধে গ্রিনল্যান্ডের নাগরিকদেরকে দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক হিসেবে গণ্য করার অভিযোগও তুলে ধরেছেন। রাশিয়া দাবি করে যে, এই ধরনের বৈষম্য গ্রিনল্যান্ডের স্বায়ত্তশাসনকে ক্ষুণ্ন করে এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামোর ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। রাশিয়া এই বিষয়গুলোকে আন্তর্জাতিক ফোরামে তুলে ধরতে ইচ্ছুক, যাতে ডেনমার্কের নীতি পুনর্বিবেচনা করা হয়।
অন্যদিকে, গ্রিনল্যান্ডের স্থানীয় কর্তৃপক্ষ স্পষ্ট করে জানিয়েছে যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কোনো আলোচনায় তাদের সার্বভৌমত্ব ও অখণ্ডতা বজায় রাখা প্রধান শর্ত হবে। গ্রিনল্যান্ডের সরকারী বিবৃতি অনুযায়ী, কোনো বহিরাগত সামরিক উপস্থিতি তাদের স্বাধীনতা ও স্বায়ত্তশাসনের ওপর প্রভাব ফেলবে না। তাই, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনার সময় এই শর্তগুলো কঠোরভাবে প্রয়োগ করা হবে।
আর্কটিক অঞ্চলে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে শক্তি প্রতিযোগিতা তীব্রতর হয়েছে; রাশিয়া, যুক্তরাষ্ট্র এবং ন্যাটো দেশগুলো ক্রমবর্ধমানভাবে এই অঞ্চলে সামরিক অবকাঠামো গড়ে তুলছে। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেন, গ্রিনল্যান্ডের কৌশলগত অবস্থান আর্কটিকের শিপিং রুট এবং প্রাকৃতিক সম্পদে প্রবেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এই প্রেক্ষাপটে রাশিয়ার সতর্কতা আঞ্চলিক নিরাপত্তা সমঝোতার একটি অংশ হিসেবে দেখা যায়।
বিশেষজ্ঞরা অনুমান করছেন, রাশিয়া এবং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে গ্রিনল্যান্ড সংক্রান্ত আলোচনার পরবর্তী মাইলস্টোন হতে পারে শীতকালীন নিরাপত্তা সম্মেলনে উভয় পক্ষের প্রতিনিধিদের উপস্থিতি। যদি এই আলোচনায় কোনো চুক্তি না হয়, তবে রাশিয়া তার সতর্কতা অনুযায়ী সামরিক ও প্রযুক্তিগত পদক্ষেপ নিতে পারে, যা আর্কটিকের সামগ্রিক নিরাপত্তা পরিবেশকে প্রভাবিত করবে।
সারসংক্ষেপে, রাশিয়া গ্রিনল্যান্ডে ন্যাটো সেনা পাঠানোর সম্ভাবনা নিয়ে কঠোর প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে এবং ডেনমার্ক ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নীতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। একই সময়ে, গ্রিনল্যান্ডের সরকারী দৃষ্টিভঙ্গি স্পষ্ট যে, তাদের সার্বভৌমত্ব রক্ষা করা কোনো আলোচনার শর্তের মূল ভিত্তি হবে। এই দ্বিমুখী অবস্থান আর্কটিকের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা কাঠামোর ওপর গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলবে।



