বার্লিন ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে ১৩ ফেব্রুয়ারি নতুন কণ্ঠস্বরের পেরস্পেকটিভস সেকশনের উদ্বোধনী চলচ্চিত্র হিসেবে জার্মান তরুণ পরিচালক কাই স্ট্যানিকের প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য ছবি ‘ট্রায়াল অফ হেইন’ (জার্মান শিরোনাম Der Heimatlose) প্রদর্শিত হয়েছে। চলচ্চিত্রটি হেইন নামের এক মানুষকে কেন্দ্র করে, যিনি মূলত উত্তর সাগরের এক দূরবর্তী দ্বীপের একমাত্র গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন এবং ১৪ বছর মূল ভূখণ্ডে কাটিয়ে ফিরে আসেন।
হেইনের প্রত্যাবর্তন প্রত্যাশার চেয়ে বেশি অস্বস্তিকর হয়, কারণ গ্রামবাসীরা তাকে চেনা না বলে দাবি করে। তার শৈশবের সেরা বন্ধু ফ্রিডেম্যানও হেইনের উপস্থিতিতে দূরত্ব বজায় রাখে, যদিও দুজনের বন্ধন আগে অটুট ছিল। গ্রামটি দ্রুতই হেইনের পরিচয় নিয়ে সন্দেহের বায়ুতে ভরে ওঠে এবং শেষ পর্যন্ত একটি গ্রাম আদালত গঠন করে, যেখানে হেইন সত্যিই তার পরিচয় কি না তা নির্ধারণের চেষ্টা করা হয়।
আদালতের শুনানিতে হেইনের শৈশবের স্মৃতি ও গ্রামবাসীর প্রত্যক্ষ বর্ণনার মধ্যে তীব্র পার্থক্য প্রকাশ পায়। একদিকে হেইন তার অতীতের উষ্ণ স্মৃতি তুলে ধরেন, অন্যদিকে গ্রামবাসী তার উপস্থিতিকে ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা করে। এই বিরোধ ধীরে ধীরে সন্দেহ থেকে উন্মুক্ত শত্রুতায় রূপান্তরিত হয়, যখন গ্রামবাসীরা হেইনকে আত্মীয় নয় এমন এক ভিন্ন ব্যক্তি হিসেবে চিহ্নিত করতে শুরু করে।
হেইন নিজের স্মৃতির সত্যতা প্রমাণ করতে নানা প্রমাণের সন্ধান করে, কিন্তু শেষমেশ বুঝতে পারেন যে তিনি নিজেই যে বাস্তবতা প্রত্যাখ্যান করছিলেন, সেটাই তার সামনে রয়েছে। চলচ্চিত্রটি আত্ম-ধোঁকাবাজি ও আত্ম-গ্রহণের দ্বন্দ্বকে কেন্দ্র করে, যেখানে ব্যক্তিগত স্মৃতি ও সামাজিক প্রত্যাশার টানাপোড়েন স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে।
চিত্রে পল বোচে, ফিলিপ গুনশ, ফিলিপ ফ্রোয়াসাঁ, এমিলিয়া শ্যুলে, জেনেট হাইন, সেবাস্টিয়ান ব্লোমবার্গ এবং স্টেফানি আমারেল সহ বেশ কয়েকজন পরিচিত অভিনেতা অভিনয় করেছেন। তাদের পারফরম্যান্স হেইনের অভ্যন্তরীণ সংগ্রামকে দৃশ্যমান করে, যা দর্শকের সঙ্গে গভীর সংযোগ স্থাপন করে।
‘ট্রায়াল অফ হেইন’ সম্পূর্ণভাবে স্ট্যানিকেরই রচনা; তিনি লিখেছেন এবং পরিচালনা করেছেন। ছবির চিত্রগ্রহণে বিশেষ নজর দেওয়া হয়েছে, যেখানে উত্তর সাগরের একাকী দ্বীপের প্রাকৃতিক দৃশ্য ও গ্রাম্য পরিবেশকে সূক্ষ্মভাবে ধারণ করা হয়েছে। এই ভিজ্যুয়াল স্টাইল গল্পের মর্মবোধকে আরও তীব্র করে, যা দর্শকের মনে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলে।
চলচ্চিত্রটি পরিচয়, স্মৃতি এবং সম্প্রদায়ের সীমাবদ্ধতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে। হেইনের গল্পের মাধ্যমে দর্শককে নিজের শিকড় ও পরিবর্তনশীল স্বত্বার সঙ্গে পুনরায় সংযোগ স্থাপনের আহ্বান জানানো হয়। দ্বীপের বিচ্ছিন্নতা ও গ্রামীয় রীতিনীতির মধ্যে গড়ে ওঠা এই নাটকীয় সংঘর্ষ আধুনিক সমাজে ব্যক্তিগত স্বাধীনতা ও সামাজিক প্রত্যাশার টানাপোড়েনকে প্রতিফলিত করে।
বার্লিন ফেস্টিভ্যালে এই ছবির প্রথম প্রদর্শনীতে অংশগ্রহণকারী দর্শক ও সমালোচকরা এর সূক্ষ্ম বর্ণনা ও দৃশ্যমান গুণমানকে প্রশংসা করেছেন। পেরস্পেকটিভস সেকশনের উদ্বোধনী চলচ্চিত্র হিসেবে নির্বাচিত হওয়ায় ‘ট্রায়াল অফ হেইন’ নতুন তরুণ চলচ্চিত্র নির্মাতাদের কণ্ঠস্বরকে আন্তর্জাতিক মঞ্চে তুলে ধরার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।
যারা পরিচয় ও স্মৃতির জটিলতা নিয়ে চিন্তা করতে পছন্দ করেন, তাদের জন্য এই চলচ্চিত্রটি একটি অনন্য অভিজ্ঞতা প্রদান করে। বার্লিনের পাশাপাশি অন্যান্য আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে এই ছবির স্ক্রিনিং শিডিউল অনুসরণ করে, অথবা অনলাইন প্ল্যাটফর্মে উপলব্ধ হলে দেখা যেতে পারে। নিজের অতীতের সঙ্গে পুনর্মিলন ও সামাজিক প্রত্যাশার মুখোমুখি হওয়ার মুহূর্তগুলোকে স্বীকৃতি দেওয়া, হেইনের যাত্রা থেকে শেখা যায়—একটি গভীর মানবিক বার্তা, যা আমাদের প্রত্যেকের জীবনে প্রাসঙ্গিক।



