বিএনপি, জামায়াত-এ-ইসলামি এবং জাতীয় নাগরিক দল ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রস্তুতির অংশ হিসেবে পরিবেশ ও টেকসই উন্নয়ন সংক্রান্ত নীতি প্রস্তাবনা প্রকাশ করেছে। প্রত্যেক দল তাদের ইশতেহারে নির্দিষ্ট লক্ষ্য ও বাস্তবায়ন পরিকল্পনা তুলে ধরে, যা ভোটারদের পরিবেশ সচেতনতা ও অর্থনৈতিক সুযোগের দৃষ্টিতে গুরুত্বপূর্ণ বলে দাবি করা হচ্ছে।
বিএনপি ২৫ কোটি গাছের চারা পাঁচ বছরের মধ্যে রোপণের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। এই উদ্যোগের জন্য গ্রামীণ স্তরে জনগণকে সক্রিয় করা হবে, পাশাপাশি ১০,০০০টি নার্সারি উদ্যোগ গড়ে তোলার মাধ্যমে মোট ৬ লক্ষ কর্মসংস্থান সৃষ্টির পরিকল্পনা করা হয়েছে। গাছ রোপণের পর ট্রি মনিটরিং অ্যাপ চালু করে বৃদ্ধির অবস্থা রিয়েল‑টাইমে পর্যবেক্ষণ করা হবে।
শহুরে এলাকায় পার্ক, ফুটপাত ও খেলাধুলার মাঠের পাশে গাছ রোপণ, দ্বীপ ও চরাঞ্চলে ড্রোনের সাহায্যে সুনির্দিষ্ট রোপণ কর্মসূচি চালু করা এবং ভবনের ছাদে বাগান গড়ে তোলার জন্য কর‑প্রণোদনা প্রদান করা হবে। এছাড়া ভবন নির্মাণে ‘সবুজ পরিমাপক মানদণ্ড’ যুক্ত করে গ্রিন সার্টিফিকেশন বাধ্যতামূলক করা হবে, যা টেকসই নগর পরিবেশ গড়ে তুলতে সহায়তা করবে।
শক্তি ক্ষেত্রে, জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার কমিয়ে ২০৩০ সালের মধ্যে নবায়নযোগ্য উৎস থেকে কমপক্ষে ২০ শতাংশ বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারিত হয়েছে। এই লক্ষ্যের জন্য সৌর, বায়ু ও জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের সম্প্রসারণে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে এবং বিদ্যুৎ গ্রিডে আধুনিকীকরণ পরিকল্পনা করা হয়েছে।
কৃষি খাতে পানিসাশ্রয়ী ও মিথেন গ্যাস নির্গমন কমানোর জন্য অল্টারনেট ওয়েটিং অ্যান্ড ড্রায়িং (AWD) পদ্ধতি প্রয়োগ করা হবে। বিশ্বব্যাংকের একটি প্রাক্কলন অনুযায়ী, বাংলাদেশে কার্বন ট্রেডিং মার্কেটের সম্ভাব্য মূল্য এক বিলিয়ন ডলার হতে পারে। এই সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে, বিএনপি কার্বন ট্রেডিং প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলার পরিকল্পনা করেছে, যাতে গাছ রোপণ ও নবায়নযোগ্য শক্তি প্রকল্পের মাধ্যমে সৃষ্ট কার্বন সঞ্চয়কে আন্তর্জাতিক বাজারে বিক্রি করা যায়।
বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ক্ষেত্রে, প্রতিটি বিভাগে একটি করে ই‑বর্জ্য পুনর্ব্যবহার প্ল্যান্ট স্থাপন করে মূল্যবান ধাতু ও উপাদান সংগ্রহের ব্যবস্থা করা হবে। এই সেক্টরে দুই লক্ষ কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারিত হয়েছে, যা তরুণ কর্মী ও প্রযুক্তি প্রশিক্ষণকে উৎসাহিত করবে।
জামায়াত-এ-ইসলামি তিনটি ‘শূন্য’ নীতি ঘোষণা করেছে: শূন্য বর্জ্য, শূন্য পরিবেশ অবক্ষয় এবং শূন্য বন্যাঝুঁকি। দলটি বর্জ্য হ্রাস, পুনর্ব্যবহার ও পরিবেশগত ক্ষতি কমানোর জন্য আইনগত কাঠামো শক্তিশালী করা এবং বন্যপ্রাণীর স্বাভাবিক বাসস্থান রক্ষার জন্য বিশেষ উদ্যোগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
জাতীয় নাগরিক দল নদী দূষণ নিয়ন্ত্রণে কঠোর পদক্ষেপের অঙ্গীকার করেছে। দলটি নদীতীরভিত্তিক ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা গড়ে তোলার মাধ্যমে নদীভিত্তিক অর্থনীতি উন্নয়ন করতে চায়, পাশাপাশি শিল্প ও কৃষি খাতে দূষণকারী পদার্থের নির্গমন কমাতে কঠোর নজরদারি ব্যবস্থা চালু করবে।
এই তিনটি দলই পরিবেশ সংরক্ষণকে নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতার মূল বিষয় হিসেবে তুলে ধরেছে। বিএনপি সবুজ অর্থনীতির মাধ্যমে কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে চায়, জামায়াত-এ-ইসলামি পরিবেশগত ক্ষতি শূন্য করার ওপর জোর দিচ্ছে, আর জাতীয় নাগরিক দল নদী সংরক্ষণ ও স্থানীয় অর্থনীতির সংযোগে মনোযোগ দিচ্ছে।
বিশ্লেষকরা উল্লেখ করছেন, যদি এই নীতিগুলো কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হয়, তবে বাংলাদেশ তার আন্তর্জাতিক পরিবেশ লক্ষ্য পূরণে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি করতে পারবে এবং কার্বন ট্রেডিং, নবায়নযোগ্য শক্তি ও সবুজ প্রযুক্তিতে বিদেশি মূলধন আকর্ষণ করতে সক্ষম হবে। একই সঙ্গে, ভোটারদের মধ্যে পরিবেশ সচেতনতা বৃদ্ধি পাবে, যা নির্বাচনের ফলাফলে প্রভাব ফেলতে পারে।
পরিবেশ সংরক্ষণ ও টেকসই উন্নয়নের এই প্রতিশ্রুতিগুলো আসন্ন নির্বাচনের সময় রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে থাকবে। দলগুলো কীভাবে তাদের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করবে এবং জনসাধারণের সমর্থন অর্জন করবে, তা দেশের ভবিষ্যৎ পরিবেশ নীতি নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।



