পাকিস্তানের জাতীয় সংসদে ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে প্রতিরক্ষা মন্ত্রী খাজা আসিফ মার্কিন সরকারের সঙ্গে দেশের কূটনৈতিক ও নিরাপত্তা সম্পর্ক নিয়ে তীব্র মন্তব্য করেন। তিনি যুক্তি দেন যে, কৌশলগত স্বার্থের জন্য মার্কিন সরকার দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার এই রাষ্ট্রকে শোষণ করেছে এবং স্বার্থ অর্জনের পর তাকে টয়লেট পেপারের মতো ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছে। এই বক্তব্য পার্লামেন্টের মঞ্চে সরাসরি দেওয়া হয়, যা দেশের অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক নীতি আলোচনায় নতুন দৃষ্টিকোণ যোগ করেছে।
খাজা আসিফের বক্তব্যে উল্লেখ করা হয়েছে যে, পাকিস্তান প্রায়ই তার সন্ত্রাসবাদের ইতিহাস অস্বীকার করে এবং তা অতীতের স্বৈরশাসকদের ভুল হিসেবে চিহ্নিত করে। তিনি বলেন, দেশের বর্তমান সন্ত্রাসী সমস্যার মূল কারণ ঐতিহাসিক ভুলের পরিণতি, বিশেষ করে ১৯৯৯ সালের সামরিক অভ্যুত্থান এবং ১১ সেপ্টেম্বর ২০০১ সালের আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদের পর মার্কিন সরকারের সঙ্গে পুনর্মিলনের ব্যয়বহুল মূল্য।
মন্তব্যে তিনি আফগানিস্তানের সঙ্গে দুইবার সংঘটিত যুদ্ধে পাকিস্তানের অংশগ্রহণকে ইসলামিক ত্রুটি হিসেবে উল্লেখ করেন। আসিফের মতে, এই যুদ্ধগুলো দেশের নিরাপত্তা কাঠামোকে দুর্বল করেছে এবং সন্ত্রাসবাদের বিস্তারে সহায়তা করেছে। তিনি অতিরিক্তভাবে জিয়া-উল-হক এবং পারভেজ মোশারফের শাসনামলে মার্কিন সরকারের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন, যদিও এই শাসনামলগুলো নিজেই সামরিক শাসন হিসেবে পরিচিত।
খাজা আসিফের বিশ্লেষণে তিনি উল্লেখ করেন যে, মার্কিন সরকার পাকিস্তানকে বহির্বিশ্বের সংঘাতে জড়িয়ে রাখে, ফলে দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা পরিস্থিতি দীর্ঘমেয়াদে প্রভাবিত হয়। তিনি বলেন, যদিও সামরিক জোটের সদস্য দেশগুলো থেকে মার্কিন সরকারের প্রভাব কমে গিয়েছে, তবু তার প্রভাব এখনও অবশিষ্ট রয়েছে।
মন্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে পার্লামেন্টের অন্যান্য সদস্যরা বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে প্রশ্ন তুলেছেন। কিছু আইনসভা সদস্য মার্কিন সরকারের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখার প্রয়োজনীয়তা জোর দিয়ে বলেছেন, অন্যরা আসিফের মতামতকে সমর্থন করে পাকিস্তানের স্বায়ত্তশাসন ও স্বার্থ রক্ষার আহ্বান জানিয়েছেন। তবে সকলেই একমত যে, দেশের নিরাপত্তা নীতি পুনর্বিবেচনা করা জরুরি।
বিশ্লেষকরা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন যে, আসিফের এই উন্মুক্ত সমালোচনা পার্লামেন্টের ভিতরে এবং আন্তর্জাতিক মঞ্চে পাকিস্তানের কূটনৈতিক অবস্থানকে প্রভাবিত করতে পারে। যদি সরকার এই সমালোচনাকে নীতি পরিবর্তনের সূচনায় ব্যবহার করে, তবে মার্কিন সরকারের সঙ্গে ভবিষ্যৎ সহযোগিতা পুনর্গঠন, সামরিক সহায়তা পুনর্মূল্যায়ন এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামোতে পরিবর্তন আনা সম্ভব হতে পারে। অন্যদিকে, যদি এই মন্তব্যকে অতিরিক্ত উত্তেজনা হিসেবে দেখা হয়, তবে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ওপর চাপ বাড়তে পারে।
খাজা আসিফের বক্তব্যের পর, পার্লামেন্টে একটি বিশেষ কমিটি গঠন করার প্রস্তাবও উঠে এসেছে, যার কাজ হবে মার্কিন সরকারের সঙ্গে পাকিস্তানের কূটনৈতিক ও নিরাপত্তা চুক্তিগুলো পুনঃমূল্যায়ন করা। এই কমিটি সম্ভাব্যভাবে অতীতের চুক্তিগুলো, সামরিক সহযোগিতা, এবং অর্থনৈতিক সহায়তার শর্তাবলী পর্যালোচনা করবে, যাতে দেশের স্বার্থ সর্বোচ্চভাবে রক্ষা করা যায়।
মার্কিন সরকার পক্ষ থেকে কোনো সরাসরি মন্তব্য এখনো প্রকাশিত হয়নি, তবে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা এই ধরনের উন্মুক্ত সমালোচনাকে পাকিস্তানের কূটনৈতিক নীতি পরিবর্তনের ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন। ভবিষ্যতে দু’দেশের মধ্যে কূটনৈতিক সংলাপের ধরন, নিরাপত্তা সহযোগিতা এবং বাণিজ্যিক চুক্তিগুলো কীভাবে পুনর্গঠন হবে, তা দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক গতিবিধি এবং আন্তর্জাতিক চাপের ওপর নির্ভর করবে।
সারসংক্ষেপে, খাজা আসিফের পার্লামেন্টে উত্থাপিত যুক্তি পাকিস্তানের নিরাপত্তা নীতি, মার্কিন সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক এবং অতীতের সামরিক শাসনের প্রভাব নিয়ে নতুন আলোচনার সূচনা করেছে। এই আলোচনার ফলাফল দেশের ভবিষ্যৎ কূটনৈতিক দিকনির্দেশনা, নিরাপত্তা কাঠামো এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার ওপর গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলবে।



