মঙ্গলবার সকালে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় একটি নতুন নির্দেশিকা প্রকাশ করে, যার মাধ্যমে সব সরকারি অনুষ্ঠান এবং বিদ্যালয়ে জাতীয় সঙ্গীত ‘জনগণ মন’ গাওয়ার আগে ‘বন্দে মাতরম্’ গীতটি বাধ্যতামূলকভাবে বাজানো হবে এবং উপস্থিত সবাইকে গীতের সময় দাঁড়িয়ে থাকতে হবে।
নতুন নিয়ম অনুসারে, এই বাধ্যতামূলক গীতবাজনা পদ্ম পুরস্কারসহ বেসামরিক সম্মাননা অনুষ্ঠান এবং রাষ্ট্রপতি উপস্থিত থাকলে যে কোনো সরকারি সমাবেশে প্রয়োগ করা হবে। একই সঙ্গে, সিনেমা হল, থিয়েটার এবং অন্যান্য জনসমাগমস্থলেও ‘বন্দে মাতরম্’ বাজানো বাধ্যতামূলক, তবে সেখানে দাঁড়িয়ে থাকা জাতীয় সঙ্গীতের মতো বাধ্যতামূলক নয়।
মন্ত্রণালয় স্পষ্ট করে জানিয়েছে যে গীতের পুরো ছয়টি স্তবক, যার মধ্যে ১৯৩৭ সালে ভারতীয় কংগ্রেস পার্টি চারটি স্তবক বাদ দিয়েছিল, সেগুলোও বাদ না দিয়ে সম্পূর্ণভাবে বাজানো হবে। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে ঐতিহাসিকভাবে স্বাধীনতা সংগ্রামের সময় গীতটি যে গুরুত্ব পেয়েছিল তা পুনরায় জোর দেওয়া হচ্ছে।
‘বন্দে মাতরম্’ গীতটি প্রথমবার ১৯০৫ সালে রাবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের রচনায় প্রকাশিত হয় এবং পরে স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রতীক হয়ে ওঠে। মন্ত্রণালয়ের এই নির্দেশিকা গীতের ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক গুরুত্বকে আধুনিক সময়ে পুনরুজ্জীবিত করার লক্ষ্যে নেওয়া হয়েছে।
নতুন নিয়মের কার্যকরী তারিখের ঘোষণা করা হয়নি, তবে মন্ত্রণালয় জানিয়েছে যে সংশ্লিষ্ট সকল সংস্থা ও প্রতিষ্ঠানকে দ্রুতই এই নির্দেশনা অনুসারে প্রস্তুতি নিতে হবে। বিদ্যালয়গুলোতে বিশেষ প্রশিক্ষণ ও সচেতনতামূলক কর্মসূচি চালু করা হবে, যাতে শিক্ষার্থীরা গীতের সময় সঠিকভাবে দাঁড়িয়ে থাকে।
সরকারি কর্মকর্তারা উল্লেখ করেছেন যে এই পদক্ষেপটি জাতীয় সংহতি ও দেশপ্রেমের অনুভূতি জোরদার করার জন্য নেওয়া হয়েছে। তারা বলেন, ‘বন্দে মাতরম্’ গীতের পূর্ণাঙ্গ সঞ্চালনা দেশের ঐতিহ্যকে সম্মান জানাবে এবং নাগরিকদের মধ্যে একতাবদ্ধতা বৃদ্ধি করবে।
কিছু রাজনৈতিক দল ও নাগরিক সংগঠন এই নতুন নিয়মকে নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। তারা যুক্তি দিয়েছেন যে বাধ্যতামূলক গীতবাজনা ব্যক্তিগত স্বাধীনতার সীমা অতিক্রম করতে পারে এবং ধর্মনিরপেক্ষতার নীতির সঙ্গে বিরোধ সৃষ্টি করতে পারে। অন্যদিকে, কিছু দল এই পদক্ষেপকে দেশের গৌরব বাড়ানোর একটি ইতিবাচক উদ্যোগ হিসেবে স্বাগত জানিয়েছে।
সামাজিক মিডিয়ায় এই ঘোষণার পর বিভিন্ন মতামত ছড়িয়ে পড়েছে। কিছু ব্যবহারকারী গীতের সম্পূর্ণ স্তবক শোনার জন্য উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছেন, আবার অন্যরা গীতের সময় দাঁড়িয়ে থাকা বাধ্যতামূলক করা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। এই বিতর্কের ফলে সরকারকে ভবিষ্যতে বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় সমন্বয় করতে হতে পারে।
আইনি দিক থেকে, মন্ত্রণালয় উল্লেখ করেছে যে নির্দেশিকা লঙ্ঘন করলে সংশ্লিষ্ট সংস্থা বা ব্যক্তির উপর শাসনব্যবস্থার নির্ধারিত শাস্তি আরোপ করা হবে। তবে শাস্তির নির্দিষ্ট রূপ ও পরিমাণ এখনো প্রকাশিত হয়নি।
পূর্বে ১৯৯৯ সালে জাতীয় সঙ্গীতের সময় দাঁড়িয়ে থাকার বাধ্যতামূলক নিয়ম চালু করা হয়েছিল, যা আজও প্রযোজ্য। নতুন নির্দেশিকাটি সেই নীতির ধারাবাহিকতা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে, তবে ‘বন্দে মাতরম্’ গীতকে অন্তর্ভুক্ত করার মাধ্যমে এটি একটি বিস্তৃত সংস্করণ।
বিশেষজ্ঞরা বিশ্লেষণ করছেন, এই পদক্ষেপটি শিক্ষাক্ষেত্রে জাতীয় গীতের প্রতি সম্মান ও পরিচিতি বাড়াতে সহায়ক হতে পারে, তবে একই সঙ্গে শিক্ষার্থীদের উপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করার ঝুঁকি রয়েছে। তারা সুপারিশ করছেন যে বিদ্যালয়গুলো গীতের সময় যথাযথ সময়সূচি ও প্রশিক্ষণ দিয়ে এই পরিবর্তনকে সহজে গ্রহণযোগ্য করে তুলবে।
মোটের ওপর, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নতুন নির্দেশিকা ‘বন্দে মাতরম্’ গীতকে দেশের সর্বজনীন সাংস্কৃতিক সম্পদ হিসেবে পুনরায় প্রতিষ্ঠা করার লক্ষ্যে গৃহীত হয়েছে। সরকার এই নীতি বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় পরিকাঠামো ও তদারকি ব্যবস্থা গড়ে তুলবে, যাতে সকল সরকারি ও বেসরকারি সংস্থায় সমানভাবে প্রয়োগ করা যায়।



