রাজশাহী শহরের তালাইমারী মোড়ে, সকালবেলা কোদাল ও ঝুড়ি হাতে জটলা প্যাক করে অপেক্ষা করা শ্রমিকদের দল দেখা যায়। তারা মূলত বিভিন্ন উপজেলা থেকে এসে শহরের শ্রমবাজারে কাজের সন্ধান করে, তবে গত এক‑দুই বছর ধরে কাজের সুযোগের অভাব তাদের দৈনন্দিন জীবনে চাপ সৃষ্টি করেছে। আগামী বৃহস্পতিবার ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে, তবে এই শ্রমিকদের জন্য ভোটের দিনই নয়, বরং কাজের অভাবের দিনই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
তালাইমারী এলাকায় শামসুল হক, পুঠিয়া থেকে আসা একজন শ্রমিক, দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন, “পেট তো আর ভোট বোঝে না ভাই, পেট শুধু ভাত বোঝে। সপ্তাহে দুই‑তিন দিন কাম না পাইলে সংসার চলবি ক্যামনে? বউ‑বাচ্চার মুখে খাবার না দিতি পারলে ঘরে অশান্তি শুরু হয়। ভোটের হাওয়ায় পেটের জ্বালার কথাও ভাবতি হয়।” শামসুল প্রতিদিন ভোরে রাজশাহী শহরে কাজের সন্ধানে যান, তবে সপ্তাহে মাত্র দুই‑তিন দিনই কাজ পান, যা তার পরিবারের জীবিকা চালাতে যথেষ্ট নয়।
শামসুলের মতই, চারঘাটের সবুজ ইসলামও একই সমস্যার মুখোমুখি। তিনি সকাল দশটা পর্যন্ত অপেক্ষা করে কাজের সুযোগের আশায় ঘরে ফেরার প্রস্তুতি নেন। সবুজ ইসলাম বলেন, “কাহাকে ভোট দিব? সবাই ভোটের আগে সুন্দর কথা কয়, পরে আর মনে রাখে না। এবারকার ভোটটা আমাদের জন্য খুব দামি। যারা আমাদের মতো গরিবের কথা ভাববি, তাদেরই আমরা দেখবি।” তিনি উল্লেখ করেন যে, রাজনৈতিক নেতারা ভোটের আগে উন্নয়ন ও কর্মসংস্থানের প্রতিশ্রুতি দিলেও, বাস্তবে শ্রমিকদের জন্য কোনো কাজের সুযোগ তৈরি হয়নি।
এই শ্রমিকরা রাজশাহী‑২, রাজশাহী‑৩, রাজশাহী‑৫ ও রাজশাহী‑৬ আসনের ভোটার। তারা জানায়, নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক দলগুলো তাদের কাছে ভোটের আহ্বান জানিয়েছে, তবে কাজের অভাবের বাস্তবতা তাদের ভোটের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করছে। একজন শ্রমিকের মতে, ভোটের মাধ্যমে যদি কাজের সুযোগের বাস্তবিক ব্যবস্থা না হয়, তবে ভোটের ফলাফলই তাদের জীবনের উন্নয়নে কোনো পার্থক্য আনবে না।
রাজশাহী শহরের শ্রমবাজারে এক‑দেড় বছর ধরে স্থবিরতা দেখা দিয়েছে। বহু শ্রমিক ভোরে এসে দুপুর পর্যন্ত কাজের অপেক্ষা করেন, তবে অধিকাংশই ফিরে যান কোনো কাজ না পেয়ে। এই পরিস্থিতি শ্রমিকদের মধ্যে হতাশা ও ক্রোধের জন্ম দিয়েছে, যা তাদের রাজনৈতিক সচেতনতা ও ভোটের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গিকে প্রভাবিত করছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেন, এই ধরনের শ্রমিক গোষ্ঠীর ভোটের গুরুত্ব বাড়ছে, কারণ তারা ভোটের মাধ্যমে সরাসরি তাদের সমস্যার সমাধান চায়। তবে বর্তমান সময়ে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিশ্রুতি ও বাস্তব কর্মের মধ্যে ফারাক স্পষ্ট, যা ভোটারদের মধ্যে সন্দেহের জন্ম দিচ্ছে।
নগর পরিকল্পনা ও শ্রম নীতি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে এখনো কোনো স্পষ্ট কর্মসূচি প্রকাশিত হয়নি। শ্রমিকদের দাবি অনুযায়ী, ত্বরিত কাজের সুযোগ সৃষ্টি, মজুরির হ্রাস রোধ এবং মৌসুমী শ্রমিকদের জন্য সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
অবশেষে, ভোটের দিন আসার সঙ্গে সঙ্গে এই শ্রমিক গোষ্ঠীর জন্য এক বড় প্রশ্ন রয়ে গেছে: ভোটের মাধ্যমে কি সত্যিকারের পরিবর্তন আসবে, নাকি আবারো ভোটের পর প্রতিশ্রুতি থেকে বাস্তবিক পদক্ষেপের অভাব থাকবে? তাদের ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে নির্বাচনের ফলাফল এবং নির্বাচিত প্রতিনিধিদের কর্মদক্ষতার ওপর।



