ঢাকার বিভিন্ন উৎসব, পার্বণ ও রাজনৈতিক সমাবেশে রঙিন বেলুনের ব্যবহার বহু বছর ধরে প্রচলিত। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে হিলিয়াম গ্যাসের পরিবর্তে সস্তা ও উচ্চ দাহ্য হাইড্রোজেন গ্যাসের ব্যবহার বাড়ছে, যা নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়িয়ে তুলেছে। হাইড্রোজেন গ্যাসের স্বল্প দহন তাপমাত্রা ও সহজে দাহ্য বৈশিষ্ট্যের কারণে সামান্য ঘর্ষণ, অগ্নিকণা বা তাপের সংস্পর্শে বেলুন দ্রুত বিস্ফোরণ ঘটাতে পারে।
২০১৯ সালে রাজধানীর মিরপুরের রূপনগর‑১১ এলাকায় হাইড্রোজেন গ্যাসে পূর্ণ বেলুনের বিস্ফোরণে ছয়টি শিশুর প্রাণ হারায়। শিশুরা বেলুন বিক্রেতার কাছ থেকে ক্রয় করেছিল, এবং বিক্রেতা গ্যাসের নিরাপদ ব্যবহার সম্পর্কে যথাযথ জ্ঞান রাখেননি বলে তদন্তের সূত্র পাওয়া যায়। একই বছর মিরপুরের এক নম্বর ঢাকা শিক্ষা বোর্ড ল্যাবরেটরি স্কুল অ্যান্ড কলেজের সামনে গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণে বেলুন বিক্রেতা নিজেই উড়ে যায়, ফলে কয়েকজন ছোট শিক্ষার্থী আহত হয়।
২০১৮ সালে যাত্রাবাড়ীর শেখদি বটতলা গুটিবাড়ীর টিনশেড বাসায় গ্যাসবেলুন তৈরির কারখানায় সিলিন্ডার বিস্ফোরণ ঘটে, যেখানে দুইজন কর্মী প্রাণ হারায়। একই বছর ফার্মগেট এলাকায় একটি শোভাযাত্রার পথে বাসের মধ্যে কর্মীদের হাতে থাকা গ্যাসবেলুনের বিস্ফোরণে দশজন কর্মী অগ্নিকাণ্ডে পীড়িত হন। এই ঘটনাগুলো হাইড্রোজেন গ্যাসের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার ও নিরাপত্তা মানদণ্ডের অভাবকে স্পষ্টভাবে প্রকাশ করে।
গ্যাসবেলুনে ব্যবহৃত হাইড্রোজেন গ্যাস সাধারণত রাসায়নিক বিক্রিয়ার মাধ্যমে সিলিন্ডারে উৎপাদিত হয়। বিক্রেতারা প্রায়শই এই প্রক্রিয়ার প্রযুক্তিগত দিক সম্পর্কে অল্প জ্ঞান রাখেন এবং নিরাপত্তা বিধি মেনে না চলার ফলে সিলিন্ডার ফাটল বা অপ্রত্যাশিত বিস্ফোরণ ঘটতে পারে। দেশের গ্যাস ব্যবহার নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি লিমিটেড (আরপিজিএসিএল) ও বিস্ফোরক কর্মকর্তার দপ্তরের অধীনে, তবে হাইড্রোজেন গ্যাসের উৎপাদন ও ব্যবহার বর্তমানে নিষিদ্ধ। তবু অনিয়মিতভাবে গ্যাস তৈরি ও বেলুনে ভরাট করা চালিয়ে যাওয়া একটি গুরুতর লঙ্ঘন।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট ঘটনাগুলোর তদন্তে পুলিশ ও স্থানীয় প্রশাসন গ্যাস সরবরাহকারী, বিক্রেতা ও উৎপাদনকারীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের প্রস্তুতি নিচ্ছে। গ্যাসবেলুনের লাইসেন্স প্রাপ্তি, সিলিন্ডারের নিরাপত্তা পরীক্ষা ও হাইড্রোজেন গ্যাসের ব্যবহার নিষেধের নির্দেশনা ইতিমধ্যে জারি করা হয়েছে। তবে বাস্তবায়নে ঘাটতি ও অবহেলার অভিযোগ রয়েছে, যা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে ত্বরিত পদক্ষেপ নিতে বাধ্য করছে।
বিশেষজ্ঞরা উল্লেখ করেন, হাইড্রোজেন গ্যাসের উচ্চ দাহ্যতা ও বিস্ফোরণশক্তি জনবহুল এলাকায় ব্যবহার করা হলে বড় আকারের প্রাণহানি ও সম্পত্তি ক্ষতি ঘটতে পারে। তাই উৎসব, মেলা ও রাজনৈতিক সমাবেশে গ্যাসবেলুনের পরিবর্তে নিরাপদ বিকল্প ব্যবহার করা অথবা হাইড্রোজেন গ্যাসের সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করা জরুরি।
অধিকন্তু, গ্যাসবেলুন বিক্রেতা ও উৎপাদনকারীদের জন্য প্রশিক্ষণ ও সচেতনতামূলক কর্মসূচি চালু করার প্রস্তাবও উঠে এসেছে। সরকারী ও বেসরকারি সংস্থাগুলোকে যৌথভাবে নিরাপত্তা মানদণ্ড নির্ধারণ, নিয়মিত পরিদর্শন ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা প্রয়োগে সমন্বয় করতে হবে।
বর্তমানে, মিরপুর, যাত্রাবাড়ী ও ফার্মগেটের ঘটনাগুলোর আইনি প্রক্রিয়া চলমান, এবং সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো গ্যাসবেলুনের অবৈধ উৎপাদন ও বিক্রয় বন্ধ করতে ত্বরিত পদক্ষেপের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। জনসাধারণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গ্যাসবেলুনের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণে কঠোর আইন প্রয়োগের প্রয়োজনীয়তা স্পষ্ট হয়েছে।



