গবেষকরা ১০ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত একটি বৈজ্ঞানিক প্রতিবেদনে জানিয়েছেন যে পৃথিবীর কেন্দ্রীয় অংশে হাইড্রোজেনের পরিমাণ এমন হতে পারে যা বহু সমুদ্রের পানির সমান। এই আবিষ্কারটি পৃথিবীর পৃষ্ঠে ঘটে যাওয়া ভূ-প্রক্রিয়ার উপর নতুন দৃষ্টিকোণ প্রদান করতে পারে।
পৃথিবীর পৃষ্ঠে সমুদ্রই সবচেয়ে বিশাল জলভাণ্ডার, তবে সাম্প্রতিক পরীক্ষায় দেখা গেছে কোরের গভীরে হাইড্রোজেনের বিশাল সঞ্চয় থাকতে পারে। গবেষণার ফলাফল অনুযায়ী, কোরের গঠনকালে হাইড্রোজেনের পরিমাণ এতটাই বেশি ছিল যে তা থেকে দশকেরও বেশি সমুদ্রের পানি গঠিত হতে পারত।
এই গবেষণাটি স্বাভাবিক বিজ্ঞান জার্নাল নেচার কমিউনিকেশন্সে প্রকাশিত হয়েছে এবং গবেষণার নেতৃত্বে ছিলেন সুইজারল্যান্ডের ETH জুরিখের ভূ-গতি বিজ্ঞানী মোতোহিকো মুরাকামি। তিনি উল্লেখ করেছেন যে কোরে হাইড্রোজেন তরল রূপে নেই, তবে তা ম্যান্টলে উঠে অক্সিজেনের সঙ্গে প্রতিক্রিয়া করে পানিতে রূপান্তরিত হয়।
মুরাকামি অনুসারে, অক্সিজেন ম্যান্টলের অন্যতম প্রধান উপাদান, তাই কোর থেকে উঠে আসা হাইড্রোজেন ম্যান্টলে সহজেই পানিতে পরিণত হতে পারে। এই প্রক্রিয়া পৃথিবীর পৃষ্ঠে জলবায়ু ও ভূ-প্রকৃতির ওপর প্রভাব ফেলতে পারে বলে অনুমান করা হচ্ছে।
পূর্বের অনুমানগুলো হাইড্রোজেনের পরিমাণ নির্ধারণে পরোক্ষ পদ্ধতি ব্যবহার করত। ঐ পদ্ধতিতে লৌহে হাইড্রোজেন যোগ করে তার আয়তন পরিবর্তন মাপা হতো, যা থেকে হাইড্রোজেনের উপস্থিতি অনুমান করা যেত। তবে এই পদ্ধতিগুলো ফলাফলে বড় পার্থক্য দেখাত।
নতুন গবেষণায় সরাসরি মাপার পদ্ধতি গ্রহণ করা হয়েছে। গবেষকরা কোরের কৃত্রিম নমুনা তৈরি করে লৌহের টুকরোকে হাইড্রোজেন সমৃদ্ধ গ্লাসে মোড়িয়ে পরীক্ষা চালিয়েছেন। এই টুকরোগুলোকে দুটি হীরক (ডায়মন্ড) দিয়ে চেপে উচ্চচাপ প্রয়োগ করা হয়।
চাপ প্রয়োগের সঙ্গে সঙ্গে হীরকের মাধ্যমে লেজার রশ্মি প্রেরণ করে নমুনাগুলোকে ৪,৮২৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস (প্রায় ৮,৭২০ ডিগ্রি ফারেনহাইট) তাপমাত্রায় গরম করা হয়েছে। এই তাপমাত্রায় লৌহ গলে সিলিকন, হাইড্রোজেন ও অক্সিজেনের সঙ্গে মিশ্রণ তৈরি করে।
মুরাকামি ব্যাখ্যা করেন, প্রাচীন পৃথিবীর কোরও এ ধরনের গলিত গুঁড়ি থেকে গঠিত হতে পারে, কারণ সেই সময়ে পৃথিবীর পৃষ্ঠে বিশাল পরিমাণে ম্যাগমা সমুদ্র বিদ্যমান ছিল। তাই কোরের গঠন প্রক্রিয়ায় হাইড্রোজেনের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
গলিত নমুনাগুলো দ্রুত শীতল করে কঠিন অবস্থা অর্জন করার পর, বিশেষ প্রোব ব্যবহার করে উপাদানগুলোর বণ্টন বিশ্লেষণ করা হয়েছে। বিশ্লেষণে দেখা গেছে লৌহের মধ্যে ছোট ছোট গঠন তৈরি হয়েছে, যেখানে সিলিকন ও হাইড্রোজেন সমান পরিমাণে উপস্থিত।
এই গঠনগুলোতে সিলিকন ও হাইড্রোজেনের পরমাণু অনুপাত একের সঙ্গে এক, যা পূর্বের গবেষণায় অনুমিত অনুপাতের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। পূর্বে অনুমান করা হয়েছিল যে কোরের হাইড্রোজেনের পরিমাণ দুই থেকে তিন গুণ বেশি হতে পারে, তবে এই সরাসরি মাপের ফলাফল তা নিশ্চিত করেছে।
একই অনুপাতের উপস্থিতি নির্দেশ করে যে কোরের গঠনকালে হাইড্রোজেন ও সিলিকন একসাথে সংযুক্ত হয়ে স্থিতিশীল গঠন গড়ে তুলেছিল। এই গঠনগুলো কোরের ঘনত্ব ও চৌম্বকীয় বৈশিষ্ট্যকে প্রভাবিত করতে পারে, যা পৃথিবীর ভূ-চৌম্বকীয় ক্ষেত্রের গঠনেও ভূমিকা রাখতে পারে।
গবেষকরা অনুমান করছেন যে কোর থেকে ম্যান্টলে হাইড্রোজেনের স্থানান্তর প্রক্রিয়া দীর্ঘ সময়ের মধ্যে ম্যান্টলকে হাইড্রোজেন সমৃদ্ধ করে, ফলে ম্যান্টলীয় অগ্ন্যুৎপাত ও ভূকম্পনের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। এ ধরনের প্রক্রিয়া পৃষ্ঠের জলবায়ু চক্রের ওপরও পরোক্ষ প্রভাব ফেলতে পারে।
এই নতুন ফলাফল কোরের গঠন ও ভূ-প্রক্রিয়ার বোঝাপড়া উন্নত করার পাশাপাশি ভবিষ্যতে পৃথিবীর অভ্যন্তরীণ গঠন মডেলকে পুনর্গঠন করার দরকারীয়তা তুলে ধরছে। বিজ্ঞানীরা এখন এই হাইড্রোজেনের সঞ্চয় কীভাবে পৃথিবীর দীর্ঘমেয়াদী ভূ-প্রকৃতিকে প্রভাবিত করে তা আরও গবেষণার মাধ্যমে জানার পরিকল্পনা করছেন।
পাঠক হিসেবে আপনি কি মনে করেন, কোরের এই হাইড্রোজেন সঞ্চয় আমাদের দৈনন্দিন জীবনে কোনো প্রভাব ফেলতে পারে? ভবিষ্যতে এই ধরনের গবেষণা আমাদের পরিবেশ ও সম্পদ ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে কী নতুন দৃষ্টিকোণ প্রদান করবে তা অনুসরণ করা গুরুত্বপূর্ণ।



