আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পূর্বে সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক অপতথ্যের প্রবাহ দেখা দিচ্ছে। বিশ্লেষকরা সতর্ক করে জানিয়েছেন, এই ধারা ভোটারদের সিদ্ধান্তে গুরুতর প্রভাব ফেলতে পারে। তথ্যের বেশিরভাগই প্রতিবেশী ভারত থেকে আসছে বলে সূত্র প্রকাশ করেছে।
২০২৪ সালে ছাত্র‑জনতা আন্দোলনের পর প্রথমবারের মতো নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে, যেখানে শীর্ষে শেখ হাসিনার পতনের পর ক্ষমতাচ্যুত সরকার ভিন্ন পথে গিয়েছে। পূর্বে প্রধানমন্ত্রী ছিলেন তিনি, এখন তিনি ভারতে আশ্রয় নিয়েছেন, যেখানে হিন্দু‑জাতীয়তাবাদী শাসন তাকে সমর্থন দিচ্ছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস জানুয়ারি মাসে জাতিসংঘের মানবাধিকার প্রধান ফলকার তুর্কের কাছে বিদেশি ও দেশীয় উভয় মাধ্যম থেকে অপতথ্যের বন্যা সম্পর্কে সতর্কতা জানিয়ে সাহায্য চেয়েছিলেন। তিনি উল্লেখ করেন, মিথ্যা তথ্যের প্রবাহ নির্বাচনকে অস্থিতিশীল করতে পারে।
বাংলাদেশ পুলিশের জানুয়ারি প্রকাশিত পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সঙ্গে যুক্ত মোট ৬৪৫টি ঘটনার মধ্যে মাত্র ১২ শতাংশকে সাম্প্রদায়িক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। বাকি ঘটনাগুলো অন্যান্য কারণের ফলাফল বলে বিবেচিত।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সেন্টার ফর দ্য স্টাডি অব অর্গানাইজড হেট জানায়, আগস্ট ২০২৪ থেকে জানুয়ারি ২০২৬ পর্যন্ত এক্স‑প্ল্যাটফর্মে ‘হিন্দু গণহত্যা’ দাবি নিয়ে এক লাখ সত্তর হাজারেরও বেশি অ্যাকাউন্ট থেকে সাত লাখের বেশি পোস্ট ট্র্যাক করা হয়েছে। এই পোস্টগুলো মিথ্যা তথ্যের বিস্তারে সহায়তা করছে।
সংস্থার প্রধান রাকিব নায়েক উল্লেখ করেন, এই পোস্টগুলোর ৯০ শতাংশেরও বেশি ভারত থেকে উৎপন্ন হয়েছে; বাকি অংশ যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার হিন্দু জাতীয়তাবাদী নেটওয়ার্ক থেকে এসেছে।
ঢাকাভিত্তিক ডিজিটালি রাইটের প্রধান মিরাজ আহমেদ চৌধুরী বলেন, বর্তমান সময়ে ভুয়া তথ্যের পরিমাণ পূর্বের তুলনায় অনেক বেশি। এআই টুলের উন্নত ক্ষমতা এখন এমন নকল তৈরি করতে পারে যা শনাক্ত করা কঠিন। তিনি ডেটা নিরাপত্তা ও তথ্য যাচাইয়ের গুরুত্ব জোর দিয়ে বলছেন।
এই অপপ্রচারের প্রভাব ভার্চুয়াল জগতে সীমাবদ্ধ নয়; ভারতীয় হিন্দু মৌলবাদীদের তীব্র প্রতিক্রিয়ার ফলে আইপিএল লিগে খেলার সুযোগ পেয়েছিলেন একমাত্র বাংলাদেশি ক্রিকেটারের চুক্তি বাতিল করা হয়েছে।
বিশ্লেষকরা স্পষ্ট করে জানান, বর্তমানে এই প্রচারকে সরাসরি ভারত সরকার পরিচালনা করছে এমন কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তবে তথ্যের উৎস ও বিতরণ পদ্ধতি নিয়ে উদ্বেগ রয়ে গেছে।
নয়াদিল্লির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় উল্লেখ করেছে, বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের ওপর বারবার আক্রমণ ঘটছে এবং তা আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। এই বিবৃতি মিথ্যা তথ্যের বিস্তারকে নিয়ন্ত্রণের আহ্বান জানায়।
নির্বাচন কমিশন ইতিমধ্যে ভোটারদের মিথ্যা তথ্য থেকে রক্ষা করার জন্য সতর্কতা জারি করেছে এবং সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করা কন্টেন্টের পর্যবেক্ষণ বাড়ানোর পরিকল্পনা করেছে। রাজনৈতিক দলগুলোও তথ্য যাচাইয়ের জন্য নিজস্ব ব্যবস্থা গ্রহণের কথা জানিয়েছে।
অবশেষে, ডিজিটাল অধিকার ও সরকারী সংস্থাগুলো একত্রে কাজ করে মিথ্যা তথ্যের বিস্তার রোধে পদক্ষেপ নিতে আহ্বান জানাচ্ছে, যাতে নির্বাচন প্রক্রিয়া স্বচ্ছ ও ন্যায়সঙ্গত থাকে এবং সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায়।



