ফ্রান্সের রাষ্ট্রপতি ইমানুয়েল ম্যাক্রন ১০ ফেব্রুয়ারি ব্রাসেলসের ইউরোপীয় ইউনিয়ন শীর্ষ সম্মেলনের আগে একাধিক ইউরোপীয় পত্রিকায় প্রকাশিত মতামতে ইউরোপকে বিশ্বমঞ্চে শক্তি হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করতে আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি উল্লেখ করেন, ইউরোপের জন্য এখনই সময় এসেছে যে নিজেকে একটি শক্তি হিসেবে উপস্থাপন করা। এই বক্তব্যটি ইউরোপীয় ইউনিয়নের ব্রাসেলস শীর্ষ সম্মেলনের পূর্বে প্রকাশিত হয়েছে।
ম্যাক্রন চীনের দ্রুত সামরিক ও অর্থনৈতিক উত্থান, রাশিয়ার আক্রমণাত্মক নীতি এবং যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক নীতি পরিবর্তনকে ইউরোপের জন্য বাড়তে থাকা নিরাপত্তা হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করেন। তিনি এ সবকে “জাগরণ সংকেত” বলে বর্ণনা করেন, যা ইউরোপকে তার কৌশল পুনর্বিবেচনা করতে বাধ্য করে। যুক্তরাষ্ট্রের আইনের শাসন থেকে দূরে সরে যাওয়া প্রবণতাকে তিনি অতিরিক্ত উদ্বেগের কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন।
ইউরোপের ক্ষমতা প্রশ্নে তিনি জোর দিয়ে বলেন, অর্থনীতি, আর্থিক ব্যবস্থা, প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা এবং গণতান্ত্রিক কাঠামোর ক্ষেত্রে ইউরোপ কি সত্যিই শক্তি হওয়ার জন্য প্রস্তুত? এই প্রশ্নই এখন ইউরোপীয় দেশগুলোর সামনে দাঁড়িয়ে আছে। তিনি যুক্তি দেন, এই ক্ষেত্রগুলোতে সমন্বিত পদক্ষেপ ছাড়া ইউরোপের স্বতন্ত্র অবস্থান বজায় রাখা কঠিন।
ম্যাক্রন উল্লেখ করেন, পূর্বে ইউরোপকে “বহুমতীয়” হিসেবে বিবেচনা করা হতো, তবে এখন সময় এসেছে যে ইউরোপ তার আর্থিক ও শিল্প ক্ষমতা একত্রিত করে একটি সমন্বিত কৌশল গড়ে তুলবে। তিনি ইউরোপীয় সংহতি ও সমন্বিত নীতি প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন। বিশেষ করে প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা ক্ষেত্রে যৌথ উদ্যোগের গুরুত্ব তিনি জোর দিয়ে বলছেন।
ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইউরোপীয় স্তরে যৌথ ঋণ গ্রহণের ধারণা পুনরায় উত্থাপন করেন, যা শিল্প বিনিয়োগের জন্য শতকোটি ইউরো তহবিল সংগ্রহে সহায়তা করবে। তিনি ইউরোবন্ডের মাধ্যমে ভবিষ্যৎ প্রকল্পের জন্য বড় আর্থিক প্রোগ্রাম চালু করার দাবি করেন। এই যৌথ ঋণকে তিনি “শেয়ার্ড ডেট ক্যাপাসিটি” বলে উল্লেখ করেন, যা ইউরোপের দীর্ঘমেয়াদী আর্থিক স্বায়ত্তশাসনকে শক্তিশালী করবে।
ম্যাক্রন অনুমান করেন, ২৭ সদস্যের ইউরোপীয় ইউনিয়নকে বার্ষিক প্রায় ১.২ ট্রিলিয়ন ইউরো (প্রায় ১ ট্রিলিয়ন পাউন্ড বা ১.৪ ট্রিলিয়ন ডলার) বিনিয়োগের প্রয়োজন হবে, যাতে অবকাঠামো, সবুজ শক্তি ও ডিজিটাল রূপান্তরের মতো ক্ষেত্রগুলোতে অগ্রগতি সম্ভব হয়। তিনি জোর দিয়ে বলেন, এই তহবিল ছাড়া ইউরোপের প্রতিযোগিতামূলকতা হ্রাস পাবে। তাই যৌথ ঋণ ও ইউরোবন্ডকে তিনি অগ্রাধিকারপূর্ণ আর্থিক সরঞ্জাম হিসেবে উপস্থাপন করেন।
এধরনের আর্থিক উদ্যোগের আগে জার্মানি ও অন্যান্য সদস্য দেশগুলো থেকে সন্দেহের মুখে পড়েছে, কারণ তারা ফ্রান্সের আর্থিক বোঝা ইউরোপের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। তারা যুক্তি দেয়, ফ্রান্সের অভ্যন্তরীণ সংস্কার না হওয়া পর্যন্ত এই ধরনের সমন্বিত ঋণ নীতি কার্যকর হবে না। জার্মানির বিশেষ উদ্বেগ হল, যৌথ ঋণ ইউরোপীয় বাজেটের স্থিতিশীলতাকে হুমকির মুখে ফেলতে পারে।
ম্যাক্রন স্বীকার করেন, ফ্রান্সের আর্থিক মডেল উত্তর ইউরোপের কিছু দেশের মতো সমন্বিত দায়িত্বশীলতা ভিত্তিক নয় এবং ২০১০ দশকের পর্তুগাল, স্পেন, ইতালি ও গ্রীসের সংস্কারগুলোই এখন ফল দিচ্ছে। তিনি উল্লেখ করেন, ফ্রান্সের নিজস্ব সংস্কার প্রয়োজন, যা এখনো সম্পূর্ণ হয়নি। এই অভ্যন্তরীণ চ্যালেঞ্জগুলো সমাধান না হলে ইউরোপীয় সমন্বিত ঋণের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন কঠিন হবে।
বিশ্ব আর্থিক বাজারে ইউরোপীয় সমন্বিত ঋণের চাহিদা বাড়ছে, তবে বর্তমান ইউরোপীয় ইউনিয়নের কাঠামো তা সরবরাহে অক্ষম বলে দেখা যায়। ম্যাক্রন বলেন, এই ফাঁক পূরণ না হলে ইউরোপের আর্থিক স্বায়ত্তশাসন দুর্বল হয়ে পড়বে। তিনি ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজেট সীমাবদ্ধতা ও ঋণ নিয়মের পুনর্বিবেচনার প্রয়োজনীয়তা উল্লেখ করেন।
বাজারে ডলারের ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে বিকল্প মুদ্রা ও ঋণ কাঠামোর প্রয়োজনীয়তা বাড়ছে। তিনি উল্লেখ করেন, বিনিয়োগকারীরা এখন এমন একটি সিস্টেম চান, যেখানে ডলার ঝুঁকি কম এবং স্থিতিশীলতা বেশি। চীনের ইউয়ান এবং অন্যান্য মুদ্রাকে বিকল্প হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে, যা ইউরোপীয় ঋণের আকর্ষণ বাড়াতে পারে।
গণতান্ত্রিক আইনের শাসনকে বিনিয়োগের বড় আকর্ষণ হিসেবে দেখা হয়, এবং এই দিক থেকে ইউরোপের স্বচ্ছতা ও ন্যায়বিচার ব্যবস্থা আন্তর্জাতিক মূলধনকে আকৃষ্ট করতে পারে। ম্যাক্রন এ বিষয়টি জোর দিয়ে বলেন, ইউরোপের শক্তি তার আইনি কাঠামোতে নিহিত। তাই তিনি ইউরোপীয় দেশগুলোকে আইনি শাসনকে আরও দৃঢ় করার আহ্বান জানান।
ম্যাক্রন চীনের কর্তৃত্ববাদী শাসন ও যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক নীতি পরিবর্তনকে ইউরোপের জন্য দ্বিমুখী চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি ভবিষ্যতে ইউরোপকে এই দুই শক্তির মধ্যে একটি স্বাধীন ও নিয়ম-ভিত্তিক অবস্থান গড়ে তুলতে হবে, যাতে বৈশ্বিক মঞ্চে তার স্বতন্ত্র ভূমিকা বজায় থাকে। এই লক্ষ্য অর্জনের জন্য যৌথ আর্থিক সরঞ্জাম ও সমন্বিত কৌশল অপরিহার্য বলে তিনি জোর দেন।



