চীন সম্প্রতি টিপিজি১০০০সিএস নামে একটি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন মাইক্রোওয়েভ অস্ত্রের সফল পরীক্ষা সম্পন্ন করেছে। এই সিস্টেমটি লো‑অর্থ অরবিটে অবস্থানরত কৃত্রিম উপগ্রহ, বিশেষ করে ইলন মাস্কের স্পেসএক্স পরিচালিত স্টারলিংক স্যাটেলাইট কনস্টেলেশনকে নিষ্ক্রিয় করার জন্য ডিজাইন করা হয়েছে।
উন্নয়নকারী দলটি উত্তর‑পশ্চিম পারমাণবিক প্রযুক্তি ইনস্টিটিউটের বিজ্ঞানীদের অন্তর্ভুক্ত, যারা ৬০ সেকেন্ড পর্যন্ত ধারাবাহিকভাবে ২০ গিগাওয়াট শক্তি উৎপাদন করতে সক্ষম একটি ছোট ড্রাইভার তৈরি করেছে। যন্ত্রটির ওজন পাঁচ টন এবং দৈর্ঘ্য চার মিটার, যা ট্রাক, জাহাজ বা বিমানের মাধ্যমে সহজে পরিবহন করা যায়।
প্রযুক্তিগত দিক থেকে এই হাই‑পাওয়ার মাইক্রোওয়েভ (এইচপিএম) সিস্টেমটি প্রচলিত ক্ষেপণাস্ত্রের মতো শারীরিক ধ্বংস ঘটায় না; বরং শক্তিশালী রেডিও ফ্রিকোয়েন্সি এনার্জি ব্যবহার করে লক্ষ্যবস্তুর ইলেকট্রনিক উপাদানকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। স্যাটেলাইটের অ্যান্টেনা, ক্যাবল বা ক্ষুদ্র ছিদ্রের মাধ্যমে প্রবেশ করে উচ্চ ভোল্টেজ তৈরি হয়, যা চিপ ও সার্কিটকে পুড়ে যায় এবং স্যাটেলাইটকে স্থায়ীভাবে অকার্যকর করে।
প্রকল্পের নেতৃত্বে থাকা ওয়াং গ্যাং উল্লেখ করেন, নতুন সিস্টেমটি এক সেশনে প্রায় তিন হাজার উচ্চ‑শক্তির তরঙ্গ প্রেরণ করতে সক্ষম। এখন পর্যন্ত দুই লাখের বেশি পরীক্ষার মাধ্যমে এর স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা হয়েছে, যা পূর্ববর্তী মডেলগুলোর তুলনায় উল্লেখযোগ্য উন্নতি নির্দেশ করে।
বিশেষজ্ঞরা জানান, এক গিগাওয়াটের বেশি ক্ষমতা সম্পন্ন তরঙ্গ লো‑অর্থ অরবিটের স্যাটেলাইটের জন্য মারাত্মক হুমকি হতে পারে। স্টারলিংক স্যাটেলাইটগুলো বর্তমানে নিম্ন উচ্চতায় কাজ করে, ফলে এই ধরনের মাইক্রোওয়েভ অস্ত্রের শিকারে পড়ার সম্ভাবনা বাড়ে।
চীনের এই প্রযুক্তি কেবল স্পেস ক্ষেত্রে নয়, সামরিক কৌশলেও নতুন মাত্রা যোগ করেছে। বিশ্লেষকরা অনুমান করেন, তাইওয়ানকে কেন্দ্র করে কোনো সংঘাতের পরিস্থিতিতে চীন এই এইচপিএম সিস্টেমকে প্রথম সারির অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করতে পারে। এতে সরাসরি মানবিক ক্ষতি না ঘটিয়ে শত্রু দেশের উপগ্রহ যোগাযোগকে ব্যাহত করা সম্ভব হবে।
এই সিস্টেমের গঠনমূলক বৈশিষ্ট্যগুলোর মধ্যে রয়েছে দ্রুত শক্তি নির্গমন, কম আকারে উচ্চ ক্ষমতা এবং বহনযোগ্যতা। ট্রাক, জাহাজ বা বিমান দিয়ে গন্তব্যে পৌঁছে, লক্ষ্যবস্তু অঞ্চলে স্থাপন করে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য শক্তি প্রেরণ করা যায়। ফলে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ উপগ্রহ নেটওয়ার্ককে অস্থায়ী বা স্থায়ীভাবে নিষ্ক্রিয় করা সম্ভব।
চীনের এই পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক মহাকাশ নিরাপত্তা সংক্রান্ত আলোচনাকে তীব্র করেছে। লো‑অর্থ অরবিটে থাকা স্যাটেলাইটগুলো বিশ্বব্যাপী যোগাযোগ, নেভিগেশন এবং তথ্য সেবা প্রদান করে; সেগুলোর ওপর এই ধরনের হুমকি সরাসরি বৈশ্বিক সাইবার ও স্পেস অবকাঠামোর স্থিতিশীলতাকে প্রভাবিত করতে পারে।
বৈশ্বিক পর্যবেক্ষকরা উল্লেখ করেন, মাইক্রোওয়েভ অস্ত্রের ব্যবহার এখনো আন্তর্জাতিক আইনের স্পষ্ট সীমা নির্ধারণে অগ্রগতি হয়নি। তাই ভবিষ্যতে এই প্রযুক্তির নিয়ন্ত্রণ ও ব্যবহার সংক্রান্ত আলোচনার প্রয়োজনীয়তা বাড়বে।
চীনের গবেষক দল ইতিমধ্যে এই সিস্টেমের আরও উন্নয়ন ও অপারেশনাল টেস্টিং চালিয়ে যাচ্ছে। লক্ষ্য হচ্ছে দীর্ঘ সময়ের জন্য উচ্চ শক্তি নির্গমন বজায় রেখে স্যাটেলাইটের ইলেকট্রনিক সিস্টেমকে নির্ভরযোগ্যভাবে নিষ্ক্রিয় করা।
এই প্রযুক্তি স্পেস নিরাপত্তা ক্ষেত্রে নতুন এক দিগন্ত উন্মোচন করেছে, তবে একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক সম্পর্কের জটিলতা বাড়িয়েছে। ভবিষ্যতে কীভাবে এই ধরনের অস্ত্রের ব্যবহার নিয়ন্ত্রিত হবে, তা গ্লোবাল নিরাপত্তা নীতির ওপর নির্ভরশীল হবে।



